
ক্যাপ্টেন(অবঃ)মারুফ রাজুঃ ঋণখেলাপ ও অর্থপাচারের দায়ে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপ কিংবা বেক্সিমকোর সাথে কোনো ধরনের সমঝোতার সুযোগ বিএনপির অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ জানতে চান- এস আলম ও বেক্সিমকো গ্রুপের অনাদায়ী ঋণ পুনরুদ্ধারে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আছে কি না এবং এস আলম গ্রুপের সাথে সরকারের কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছে কি না।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে কারো সাথে অনৈতিক সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, বিএনপি যখনই সরকার গঠন করেছে, আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে আমাদের রেকর্ড অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘যারা ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পালিয়ে গেছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সুতরাং নিশ্চিত থাকুন, আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় অপরাধীদের সাথে কোনো আপস নেই।’
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার
বিদেশে পাচার করা সম্পদ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে মন্ত্রী সংসদকে জানান, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হদিস পেতে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থা নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার একটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাড়া ও তথ্য পাওয়ার পর আইনি পন্থায় সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
সম্পদ উদ্ধারের সময়সীমা ও পরিমাণ প্রসঙ্গে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান বা আগামী অর্থবছরে ঠিক কত টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হবে, তার সঠিক মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং এটি জোরালোভাবে চলবে।’
উল্লেখ্য, এস আলম গ্রুপের পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে এরইমধ্যে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, সাইপ্রাস, জার্সি ও সিঙ্গাপুর, এই চার দেশে এবং বেক্সিমকো গ্রুপের সম্পদের সন্ধানে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরকারের পক্ষ থেকে ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট’ (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে।
বৈদেশিক ঋণ : বাড়তি চাপ, নিয়মিত পরিশোধের দাবি
দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি-বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের উচ্চমাত্রা, ব্যাংক খাতের সঙ্কট, পুঁজি ঘাটতি এবং সরকারের ঋণনির্ভরতা- নিয়ে জাতীয় সংসদে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংক খাত পুনরুজ্জীবন, আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বেসরকারি খাতকে সহায়তার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৬৭ দশমিক ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৯ লাখ ৭৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা- অর্থাৎ পৌনে ১০ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রায় ৯০.৬৬ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রতি অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করে বাজেটে তার সংস্থান রাখে এবং নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ করা হয়।
২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৮৫ হাজার ৯৯২ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন ডলার ঋণ গ্রহণ এবং একই সময়ে ২২ হাজার ৩২৮ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন ডলার মূলধন ও ৮ হাজার ৬৯৬ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধের তথ্যও তুলে ধরেন তিনি।
ব্যাংক খাত : পুঁজি সঙ্কট ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা
অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে বড় ধরনের পুঁজি ঘাটতির মুখে রয়েছে। জাতীয় মুদ্রার ৪০ শতাংশের বেশি অবমূল্যায়ন, উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অতীতের আর্থিক অনিয়ম- সব মিলিয়ে এই সঙ্কট তীব্র হয়েছে।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতেও প্রায় ৫০ শতাংশ পুঁজি ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার- ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ কর্মসূচি; আন্তর্জাতিক অংশীদারের (বিশেষ করে আইএমএফ) সহায়তা; বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ- এসব উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
ব্যাংক ঋণনির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সরকারের ঋণনির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার মাত্র ৫২ দিনের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এপ্রিলের শুরুতেই তা এক লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশেরও বেশি।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে, ফলে ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় করের আওতা বাড়ানো ও রাজস্ব বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জানতে চান তিনি।
সরকারের অবস্থান : ধীরে কমবে ব্যাংক ঋণনির্ভরতা
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান ঋণের বড় অংশই পূর্ববর্তী সরকারের দায়ের ধারাবাহিকতা। বর্তমান সরকার অল্প সময় ধরে দায়িত্বে রয়েছে এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে।
তিনি আশ্বস্ত করেন, ভবিষ্যতে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ কমানোই সরকারের মূল নীতি এবং আগামী বাজেট থেকেই এর প্রতিফলন দেখা যাবে।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, দেশের ব্যবসায়ীরা বর্তমানে নানা সঙ্কটে রয়েছেন এবং ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত পুনরুদ্ধারেও সময় লাগবে। তবে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনীতি আবার শক্ত অবস্থানে ফিরে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ব্যাংক একীভূতকরণ ও আমানতকারীদের সুরক্ষা
অর্থমন্ত্রী জানান, একীভূত হওয়া পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাংক রেজুলিউশন অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে প্রত্যেক অপ্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করা হচ্ছে। অবশিষ্ট অর্থ পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হবে। পাশাপাশি কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যান্সারসহ গুরুতর রোগে আক্রান্ত গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় অর্থ ছাড় দেয়া হচ্ছে।

