DMCA.com Protection Status
ADS

সরকার ম্যাসাকার করবে; রক্ত ও বারুদের গন্ধ পাচ্ছি: ফরহাদ মজহার

105773_1"বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারো খানিকটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির আন্দোলনের পুরোপুরি যৌক্তিকতা রয়েছে। বিএনপিই আমাদের একমাত্র ভরসা। তবে তারা আওয়ামী লীগ সরকারের চরিত্র এবং বাস্তবতা বোঝে না। সরকার তার জানবাজিতে যে কোনো ধরণের ম্যাসাকার করতে প্রস্তুত। আমি রক্ত এবং বারুদের গন্ধ পাচ্ছি।"

রেডিও তেহরানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট সমাজচিন্তক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহার। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "বিনাভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকার অসাংবিধানিক এবং অবৈধ।"

ফরহাদ মজহার তার ভাষায় বলেন, "যে ফ্যাসিস্ট ক্ষমতা আওয়ামী লীগের আছে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে ব্যবহার করার যে সরকারি চেষ্টা আমরা দেখছি তাদের পক্ষ থেকে, পরিষ্কারভাবে তাকে মোকাবেলা করা বিএনপির পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।" বাংলাদেশ এই মুহুর্তে একটি মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


রেডিও তেহরান: ৫ জানুয়ারিকে সামনে রেখে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দু’ দিনের সমাবেশের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। যতদূর জানা-বোঝা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে সরকার-বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা আরো বড় কর্মসূচি নিতে চায়। বিএনপির এইসব কর্মসূচির যৌক্তিকতা কি?সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন গাজী আবদুর রশীদ। পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো

ফরহাদ মজহার: বিএনপির আন্দোলনের এবং কর্মসূচির যৌক্তিকতা অবশ্যই রয়েছে। বিএনপি বাংলাদেশের বড় একটি রাজনৈতিক দল। আর বিরোধী দল হিসেবে যদি বিবেচনা করি তাহলে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী দল। পাঁচ জানুয়ারির যে নির্বাচন হয়েছিল তা প্রায় ১ বছর হতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই নির্বাচনের যেমন কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই তেমনি সাংবিধানিক ভিত্তিও নেই। যদিও সরকার দাবি করে এর সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা ছিল।

আমি বলব সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা এক বিষয় আর নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা আরেকটি বিষয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র এবং সরকারের। আমরা নাগরিকরা ভোট দিতে পারি নি। সেই বিনাভোটে ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের ভোটের অধিকারকে লঙ্ঘন করা হয়েছে। ফলে সাংবিধানিক দিক থেকে এটা একটা অসাংবিধানিক সরকার।

আর সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিএনপির আন্দোলন করা উচিত ছিল আরো অনেক আগ থেকেই। তবে আমরা প্রত্যেকেই জানি বিএনপির নিজস্ব সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে। একইসঙ্গে বর্তমান সরকার দমন নীপিড়নের যে রাস্তা নিয়েছে এমনকি গুলি, হত্যা, গুম- খুন তো রয়েছে একইসাথে রয়েছে আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এর পরিপ্রেক্ষিতে এখানে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন।

তার মানে হচ্ছে একটি সাংবিধানিক বা আইনি অধিকারকে আশ্রয় করে বা আমল করে এখানে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি গড়ে তোলা আওয়ামী লীগ সরকার অসম্ভব করে তুলেছে। আর সেজন্যেই হয়তোবা বিএনপি আন্দোলনে ভালো কিছু করতে পারছে না। সন্ত্রাসী যে ক্ষমতা আওয়ামী লীগের আছে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে ব্যবহার করার যে সরকারি চেস্টা আমরা দেখছি তাদের পক্ষ থেকে, পরিষ্কারভাবে তাকে মোকাবেলা করা বিএনপির পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।

আর সে প্রেক্ষিতে আমি মনে করি যখন ৫ জানুয়ারির সেই অবৈধ নির্বাচনের প্রায় এক বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে তখন ঐ দিনটি তো বিএনপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আমি মনে করি আন্দোলন বিএনপিকে করতেই হবে। আর পাঁচ তারিখের পর যদি বিএনপি কিছু করতে না পারে তাহলে এর পরিণতি বিএনপির জন্যও অত্যন্ত নেতিবাচক হবে।

রেডিও তেহরান: বিএনপি জোটের কর্মসূচির বিরুদ্ধে সরকারি দল বার বার বলছে, তাদেরকে একদিনের জন্যও মাঠে নামতে দেয়া হবে না। সরকারি দলের এ অবস্থানকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ফরহাদ মজহার: সরকারি দল ঘোষণা দিচ্ছে যে, বিএনপিকে মাঠে নামতে দেবে না। ছাত্রলীগ ঘোষণা দিচ্ছে যে ‘ন্যাড়ি কুত্তার’ মতো বিএনপির সিনিয়র নেতাদের পেটাবেন। যদি এরকম বলা হয় তাহলে বাংলাদেশে যারা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী বা যারা আওয়ামী লীগের পক্ষে যুক্তি বুদ্ধি দিচ্ছে তাদের বক্তব্য আমাদের বিস্মিত করে।

মানে সমাজটা এমন এক জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে এই ধরণের একনায়কতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে জনমতও থাকে। আর এটাকেই ফ্যাসিবাদ বলে। আর সরকারের এই ফ্যাসিবাদকে মোকাবেলা করার যে প্রজ্ঞা বা দূরদৃষ্টি এবং যে সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিকভাবে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা বিএনপির আদৌ আছে কি না সে বিষয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে।

তবে এই সরকারের চরিত্র সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিকভাবেও বিতর্কের বাইরে। কিছুদিন আগে আমি লন্ডন থেকে ঘুরে এসেছি। সেখানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে তারা কেউই মনে করে না বাংলাদেশের বর্তমান সরকার একটি বৈধ সরকার।

ফলে যে সরকারটি বৈধ নয় একইসঙ্গে তারা যে সন্ত্রাসকে ব্যবহার করছে সেটা অগণতান্ত্রিক। আর সরকার সন্ত্রাসী শক্তি ব্যবহার করতে পারছে এই কারণে যে এই শক্তির পক্ষে সমাজের একটা অংশ রয়েছে। এটি একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা বা শুধু অবৈধ ক্ষমতা না; এটা একটা ফ্যাসিস্ট শক্তি। একে মোকাবেলা করা অত্যন্ত কঠিন।

এ বিষয়টি আমি অনেক আগেই বলেছি। এ সম্পর্কে আমার একটা বই বেরিয়েছে এরইমধ্যে হয়তো আপনাদের চোখেও পড়তে পারে। এই যুদ্ধ অনেক দীর্ঘ এবং বেশ কঠিন। শেখ হাসিনা যখন এবার নির্বাচিত হয়ে এলেন ঠিক তখনই বলেছিলাম বাংলাদেশের পরবর্তী গণতান্ত্রিক এমনকি উদারনৈতিক পরিস্থিতিতে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে। এটা একমাত্র সম্ভব যদি গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বিএনপির একটি শক্ত ঐক্যের জায়গা তৈরি হয়। তবে সেখানে বিএনপির মারাত্মক মতাদর্শিক ঘাটতি আছে। বিএনপির সঙ্গে যারা আছেন তাদেরকে কেবলই নির্বাচনী মোর্চা বলে মনে করে তারা।

এটাকে আদর্শগত জায়গা মনে করছে না। আর এটি বিএনপির জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক বলে আমি মনে করি। কারণ বাংলাদেশের জনগণ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তখনই লড়বে যখন বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধীনে ইসলামপন্থী থেকে শুরু করে বামপন্থী সবাইকে একটি জায়গায় আনার রাজনৈতিক আদর্শগত অবস্থান তৈরি করবে। সেটি না করা গেলে বিএনপির খুবই খারাপ পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি সামনের দিকে। তারমানে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত করুণ পরিণতি ডেকে আনবে।

রেডিও তেহরান: বলা হয়- বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রয়েছে, নানা সমীকরণও আছে যে কারণে বিএনপি জোটের আগের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ বিএনপি জোট পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সমর্থন পায় নি। কথাটা কতটা সত্য এবং এবার কি তারা পর্যাপ্ত সমর্থন পাবে?

ফরহাদ মজহার: বিএনপির আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাব আছে বলে আমি মনে করি না। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে আওয়ামী লীগ যতই প্রোপাগান্ডা চালাক না কেন তাদের সম্পর্কে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গী নেতিবাচক নয়।

জামায়াতে ইসলামীর ৭১'সালে ভূমিকার ব্যাপারে আমাদের যে অভিযোগগুলো আছে, দেশের জনগণের যে ন্যায়সঙ্গত অবস্থান আছে এবং যার সুবিচার চায় সেটা আলাদা তর্কের বিষয়। কিন্তু দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে একটি গণতান্ত্রিক এবং মডারেট দল হিসেবে মনে করে আন্তর্জাতিক সমাজ।

এখানে হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে যে প্রোপাগান্ডা ছিল সেটিও আজ আর দেখা যাচ্ছে না। অন্তত আমি যাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করি তারাও হেফাজত সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে না। হেফাজত গণতন্ত্র বিরোধী এমনটি মনে করে না দেশের মানুষ।

সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের দুটো স্টেটমেন্ট অনেকের চোখে পড়ার কথা। সুন্দরবন সম্পর্কে তাদের গুরুত্বপূর্ণ একটা বিবৃতি ছিল। আর এ থেকে বোঝা যায় তারা অনেক বেশি সমাজ সচেতন। সমাজের প্রতি এবং সামাজিক ইস্যুগুলোতে তাদেরকে অনেক সচেতন বলে মনে হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সমর্থনের কথা যদি আপনি বলেন তাহলে বিএনপি এ সমর্থন থেকে কখনই বাইরে ছিল না।

বরং পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দুটো থিসিস ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। একটাকে বলি দিল্লির থিসিস এবং অন্যটা ওয়াশিংটন থিসিস।

দিল্লির থিসিসটা হচ্ছে–বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে একটা নির্বাচন হয়ে গেছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব যদি আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক শক্তি অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করে। কূটনৈতিক সহায়তা দেয় যারফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে। আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলেই বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা আসবে।

আর ওয়াশিংটন থিসিস হচ্ছে- বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল তখনই সম্ভব যদি সবারকাছে গ্রহণযোগ্য স্বচ্ছ একটা নির্বাচন হয়। কিন্তু বিএনপি হঠাৎ করে তাদের আন্দোলন বন্ধ করে দেয়। আর সেই আন্দোলন বন্ধ করার ফলে দিল্লির থিসিসটা স্থায়ীত্ব পায়। বলা হয়ে থাকে বিএনপি যেহেতু আন্দোলন করেনি এবং সরকারের বিরুদ্ধে সত্যিকারার্থে বিশেষ কোনো প্রতিবাদ বা এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে নি যাতে পরিস্থিতিকে রাজনৈতিভাবে অস্থিতিশীল বলা যায়।

এখানে বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলে মারাত্মক পরাজয় ঘটেছে বলে আমি মনে করি। আর বিএনপি এটা কিভাবে কাটিয়ে উঠবে তা আমি জানি না। তবে বর্তমানের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপিকে সেটা প্রমাণ করতে হবে। তাছাড়া বিএনপিকে এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণ হবে।

তবে এই ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে বিএনপি কিভাবে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করবে সেটা আমি ভেবে পাই না। তবে বিএনপি যেটা করতে পারতো সেটা হচ্ছে অন্যান্য দল বিশেষ করে ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে তাদের আদর্শিক জায়গায় একটা ঐক্যে পৌঁছানো। এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে। তবে বিএনপি তা এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট করতে পারেনি। বিএনপি মনে করে যে অন্য ইসলামপন্থী দলগুলো তাদের জন্য রাস্তায় নেমে আন্দোলন করবে এবং তাদের জন্য তারা প্রাণ দেবে তারপর তারা ক্ষমতায় যাবে। কিন্তু বিএনপি আসলে ক্ষমতায় গিয়ে কি করতে চায়; বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে, দিল্লির প্রতি এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি, গণপ্রতিরক্ষা, অর্থনৈতিক নীতি, পঞ্চদশ সংশোধনীর পর বর্তমান সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিস্ট যে সংবিধান রয়েছে সে প্রশ্নে বিএনপি কিভাবে এগিয়ে আসবে সে ব্যাপারে কোনো বক্তব্য বিএনপির কাছ থেকে আমরা এ পর্যন্ত দেখতে পাই নি।

তবে বিএনপি চেয়ারপারনের একটি কথা আমার খুব স্পষ্টভাবে মনে আছে। সেটি হচ্ছে দেশের জনগণ যা চায় না তা বাংলাদেশের সংবিধানে থাকবে না। এ কথাটি বেগম খালেদা জিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন। কিন্তু এরপর বিএনপি নেতাদের আর কোনো বক্তব্য-দেশের বর্তমান সংবিধানে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কি সে ব্যাপারে কোনো কথা আমরা শুনি না। সংবিধান কি এভাবেই থাকবে! যদি তারা পরিবর্তন করতে চায় তাহলে কিভাবে তা করবে? ফলে বিএনপি যতক্ষণ পর্যন্ত না রাজনৈতিক প্রশ্নে স্বচ্ছ এবং সঙ্গত দাবি সে হাজির করতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি মনে করি না যে এধরণের একটি ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে বিএনপি একা লড়াই করে কিছু করতে পারবে না। যদি আল্লাহ সরাসরি কিছু দেয় কোনো সেটা ভিন্ন কথা।

রেডিও তেহরান: আপাত দৃষ্টিতে বিএনপি জোটের আগের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। এবার কি মনে হয় তারা সফল হতে পারবে? এ ক্ষেত্রে তাদের আন্দোলনের ধরণ কি হওয়া উচিত?

ফরহাদ মজহার: দেখুন আন্দোলন সফল করার বিষয়টি আপনি কোন অর্থে বলছেন সেটি ব্যাখ্যা করতে হবে। আন্দোলন সফল মানে এই নয় যে বর্তমান আন্দোলনের মধ্যে সরকার নির্বাচন দেবে এবং সেই নির্বাচনে বিএনপি জিতে আসবে। আমি সেরকম কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। কারণ বর্তমান আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে এমন কোনো আন্দোলন বিএনপির পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না যাতে একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটবে।

তাছাড়া আমাদের একটি কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা যদি বিবেচনা করি তাহলে আমরা যেটা দেখতে পাব সেটি হচ্ছে বর্তমান যে সরকার আমাদের আছে অর্থাৎ সরকারের ধরণ সম্পর্কে- তাতে বলা যায় এটি একটি মাফিয়া স্টেট।

একে মাফিয়া স্টেট একারণে বলা হয় যে, অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বড় বড় কোম্পানিগুলো বিক্রি হয়ে গেছে মাফিয়াদের কাছে। অর্থাৎ যারা স্বাভাবিকপথে বা বিভিন্ন রকম অশুভ পথে যারা অর্থ উপার্জন করেছে এমন লোকদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে বড় বড় কোম্পানি। আর এসব মাফিয়ারা তৃতীয় বিশ্বে গিয়ে বিনিয়োগ করতে চাইছে। আর তারা পুরোপুরি বাংলাদেশের মতো অবৈধ একটা সরকারকে বেছে নিয়েছে যে সরকারের কোনো গণভিত্তি নেই। এ সরকারটি ক্ষমতায় থাকার জন্য নিষ্ঠুর এবং নির্মম যেকোনো পথ তারা গ্রহণ করতে পারে। আর সেজন্যই এ সরকারের সঙ্গে মাফিয়াদের আঁতাত থাকতে পারে। ফলে আমার ধারণা বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি এই মুহুর্তে একটি মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এবং তাকে পরিবর্তন করা এই ধরণের আন্দোলনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটা একমাত্র সম্ভব বাংলাদেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা। আর ঐক্যবদ্ধ করার মানে হচ্ছে ভবিষ্যতের একটা স্পষ্ট দিক নির্দেশনা দেয়া।

বিএনপি যদি বলে যে তারা একটি নির্বাচন চায় এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায়; তাতে দোষ নেই কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে আপনারা কি করবেন, কিভাবে বাংলাদেশের সংবিধানকে আপনারা আবার গণতান্ত্রিক হিসেবে রুপান্তর করবেন অর্থাৎ কি ধরণের প্রতিষ্ঠান আপনারা গড়ে তুলবেন তা স্পষ্ট করতে হবে। স্পষ্ট করতে হবে বিচার বিভাগকে কিভাবে গড়ে তুলবেন, সেনাবাহিনীর ব্যাপারে কি করবেন,পুলিশকে কিভাবে সাজাবেন, বাংলাদেশের সামাজিক পরিস্থিতিকে কিভাবে বদলাবেন তা স্পষ্ট করতে হবে। তবে এসব করার সামর্থ দূরে থাকুক এটা চিন্তা করার সামর্থ বিএনপির আছে কিনা সেটা তাদের প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু বিএনপির আশেপাশে যাদেরকে আমরা দেখছি তাদের মধ্যে এমন লোককে দেখছি না যারা বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন করে কিছু করতে পারেন।

ফলে বাংলাদেশের জন্য এটা দুর্ভাগ্য হবে, একটা মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে যদি বিএনপি ব্যর্থ হয়। বর্তমান সমাজের লক্ষণ হচ্ছে একদিকে ফ্যাসিবাদ অন্যদিকে জনগণ। দুটো ভাগে ভাগ হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বৃহত্তর ঐক্য ছাড়া সম্ভব না। শুধু তাইনয় সেই ঐক্যের মধ্যে থাকতে হবে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের লেবাস। এটি ছাড়া সম্ভব নয় এবং এটি না থাকলে আন্তর্জাতিকভাবেও আমরা গ্রহণযোগ্য হব না। ফলে বিএনপি ছাড়া বাংলাদেশে আমাদের উপায় নেই। তবে বিএনপি যেভাবে করছে সে ব্যাপারে তাদের নিজেদেরও কোনো উপলব্ধি আছে কিনা তা নিয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে।

তবে আমি নিজে এটা বিশ্বাস করি যে বেগম খালেদা জিয়া তিনি নিজে হয়তো এ বিষয়গুলো বুঝতে পারছেন এবং উপলব্ধি করতে পারছেন কিন্তু তার দলের যে সীমাবদ্ধতা তা তিনি অতিক্রম করতে পারছেন না। তাকে সহায়তা করার মতো এবং সতিক্যারার্থে তাকে পরামর্শ দেয়ার মতো কাউকে তার আশেপাশে দেখছি না।

রেডিও তেহরান: আন্দোলন মোকাবেলায় সরকারের অতীত এবং বর্তমান কৌশলগুলোকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ফরহাদ মজহার: আমি বলবো যে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য যে কোনো বড় ধরণের ম্যাসাকার করতে কুন্ঠিত হবে না। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি এবং বাকশালের সময়কার পরিস্থিতির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। কারণ এ সরকার জানে তার সময়ে যে সম্পদ লুট হয়েছে, যেভাবে মানুষ হত্যা-গুম করেছে, আইন বহির্ভূতভাবে মানুষ হত্যা করেছে তা সীমাহীন। পাঁচ মে শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের আলেম ওলামাদের যেভাবে তারা মেরেছে; নির্যাতন করেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ওপর যেভাবে ক্রমাগত অত্যাচার চালাচ্ছে, তাদেরকে জেলে ঢুকিয়েছে, পুলিশ কাস্টুডিতে পিটিয়ে হত্যা করেছে- এমন একটা পরিস্থিতিতে সরকার ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে আওয়ামী লীগের পক্ষে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসা হবে দুঃসাধ্য। ফলে এটা সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটা জানবাজি মোকাবেলা।

ফলে সরকারি দল যেকথাগুলো বলছে সেটা ভয় দেখাবার জন্য বলছেন না; তারা এটা মিন করেন। কেন তারা এটা মিন করেন সেটা তাদের পক্ষ ভাবলে বোঝা যায়। কারণ তারা ক্ষমতায় না থাকা মানে বড় ধরণের একটা বিপদের মুখে পড়তে হবে আওয়ামী লীগকে, গণরোষের মুখে পড়তে হবে। আর এই ভয়াবহ গণরোষের হাত থেকে আওয়ামী লীগকে বাঁচতে হলে তাদের সামনে একটিই মাত্র পথ খোলা আছে। সেটা হলো যে কোনো মূল্যে আন্দোলনকে প্রতিহত করা, সন্ত্রাসের মাধ্যমে শাসন চালানো প্রয়োজনবোধ করলে ম্যাসাকার করা। আর সেটা করার জন্য আওয়ামী সব সময় একপায়ে খাড়া। তাদের আচার আচরণে,কথাবার্তায় সেটা পরিষ্কার। তাদের গণমাধ্যমগুলোসহ সববিভাগকে যেভাবে সাজানো হয়েছে তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য তাতে এটা পরিষ্কার যে বড় ধরণের ম্যাসাকার করলেও আওয়ামী লীগ মনে করতে যে তারা এটা করে পার পেয়ে যেতে পারে।

দিল্লির বর্তমান পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয়িষ্ণু পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বড় ধরণের ম্যাসাকার করা সম্ভব। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের এইকালে-যেখানে ইসলাম এবং ইসলামপন্থীরা দুষমন, তাদেরকে দুষমন গণ্য করে বিএনপিসহ অন্যান্যদের যেকোনোভাবে দমন করার জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনো আইন মানবে না। তারা এসবের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।

আমার ভয়টা হচ্ছে, বিএনপি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের এই বাস্তব পরিস্থিতি এবং চরিত্রটা মাথায় রাখছে না। আমি মনে করি এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করা, বোঝানো এবং সাংগঠনিক যে ধরণের কাঠামো দরকার, ঐক্য গড়ে তোলা দরকার সেদিকে তারা যত্নবান হবে। মোর্চাকে আরো ঘনিষ্ট করে শক্তিশালী করতে হবে। তবে বিএনপি এখনও মনে করে তারা আন্দোলনের ডাক দেবেন এবং সেই ডাকে ইসলামন্থীরা ঝাপিয়ে পড়বে। জামায়াতের আর কোনো উপায় নেই তারা বিপদের মধ্যে আছে আর হেফাজতে ইসলাম মনে করে তাদের ঈমান আকিদা রক্ষার জন্য বিএনপি তাদের একমাত্র ভরসা। ফলে তারা সবাই বিনএনপির ডাকে রাস্তায় নেমে আসবেন। আমি তেমনটি মনে করি না। যদি সেটা হয় তো খুব ভালো কথা। আমি হয়তো খুব বেশি খুশি হবো। তবে আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে যতটুকু বুঝতে পারি-বাংলাদেশে তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে আমি সামনের দিকে ভয়াবহ বিপদ দেখছি। আমি রক্ত এবং বারুদের গন্ধ পাচ্ছি!

Share this post

scroll to top
error: Content is protected !!