দৈনিক প্রথম বাংলাদেশ প্রতিবেদনঃ বর্তমান বিশ্বের অনেক মুসলিমের কাছেই রাজনৈতিক ইসলাম খুবই গ্রহণযোগ্য একটি প্রস্তাবনা এবং তাদের প্রত্যাশা, এটি তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সমস্যাগুলোর একটা সমাধান দেবে। কিন্তু বেশিরভাগই জানেন না এটি কীভাবে সম্ভব।
আজকের বিশ্বে যেটি ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ নামে পরিচিত ঊনিশ শতকের প্রথমভাগ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে সেই প্রপঞ্চটি সম্পর্কে প্রথম একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেন ব্রিটিশ ভারতের জামালুদ্দিন আফগানি এবং সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদুদী, মিশরের হাসান আল-বান্না ও সাইয়্যেদ কুতুব এবং ইরানের আলী শরিয়তী।
তারা যা লিখেছিলেন তা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল এমন একটি সময়ে যখন আজকের বেশিরভাগ মুসিলম রাষ্ট্রগুলোই হয় সরাসরি ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণে ছিল অথবা সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে বা উপনিবেশের অধীনে থেকেই সংগ্রামে লিপ্ত।
ঔপনিবেশিক শাষণকালের সমাপ্তি পশ্চিমা প্রভাব থেকে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তিও এনে দেবে- জাতীয়তাবাদীদের এমন বিশ্বাস থাকলেও মৌলবাদীরা এটি কখনো বিশ্বাস করেননি।
পাকিস্তানের জামায়াত-ই-ইসলামি পার্টির নেতৃস্থানীয় একজন বুদ্ধিজীবী খুরশীদ আহমেদের মতে, ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশ ছেড়ে চলে গেলেও তারা একটি ব্যবস্থা (সিস্টেম) রেখে যায় এবং সেই ব্যবস্থা চালিয়ে নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত লোকও রেখে যায়। যা পূর্বে অধ্যুষিত জাতিগুলোকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা পেতে বাধা দেয়।
একটি ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণা
অর্থনীতি: পৃথিবীর ধনী দেশগুলোর কাছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ৩ লাখ ২৪ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ রয়েছে। পৃথিবীর মাত্র ১ শতাংশ ধনীর উপার্জন গোটা বিশ্বের ৫৭ শতাংশ মানুষের উপার্জনের সমান।
এ বৈষম্যের জন্য খুরশীদ আহমেদ ও সমমনা অন্য ইসলামি অর্থনীতিবদরা সুদভিত্তিক অর্থনীতিকে দায়ী করেন এবং এ কারণে তারা সুদমুক্ত একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী।
সংস্কৃতি: মৌলবাদীদের আরেকটি বড় অভিযোগ রয়েছে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিষয়ে। পশ্চিমা সংস্কৃতির স্থলে তারা ইসলামি সংস্কৃতি চান।
কিন্ত ‘ইসলামিক সংস্কৃতি’ নিজেই একটি বিতর্কিত শব্দ। সাংস্কৃতিকভাবে ইরান ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমরা আরব মুসলিমদের থেকে ততটাই আলাদা যতটা তারা সবাই পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে পৃথক। আসলে এরা সবাই একে অন্যের থেকে যতটা সাংস্কৃতিক উপাদান নিয়েছে তার চেয়ে ঢের বেশি নিয়েছে পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে।
রাজনীতি: রাজনৈতিকভাবে ইসলামি বিশ্ব আরও বেশি বিভক্ত। ৫০টিরও বেশি মুসলিম দেশের মধ্যে সম্ভবত যে একটি মাত্র মিল রয়েছে তা হলো- এগুলোর বেশিরভাগই শাষণ করছেন কোনো না কোনো স্বৈরাচারী শাসক।
বিশ্বের প্রধান মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বেশক’টিরই একে-অন্যের সঙ্গে বেশ বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে; যার কারণে তারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে পর্যন্ত জড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার সংঘর্ষ এবং ইরাকে হঠাৎ করে আইএসআইএসের একাধিক সুন্নি অধ্যুষিত শহর দখল আরও একবার নিশ্চিত করলো যে- অনেকের কাছেই তথাকথিত ‘কাফের’দের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চেয়ে বিপরীত উপদলগুলোর সঙ্গে লড়াইটাই গুরুত্বপূর্ণ।
ইরাক এবং সিরিয়ায় জাতিগত পার্থক্যের বিস্তারে আরব এবং অ-আরব কিছু প্রতিবেশী দেশ যে ভূমিকা রেখেছে তা থেকে এই পূর্বাভাস পাওয়া যায় যে- মধ্যপ্রাচ্য হয়েতো শিগগিরই ব্লকে বিভক্ত হয়ে যাবে। ইরান, ইরাক, লেবাননের কিছু অংশ এবং সিরিয়া হয়তো গঠন করবে শিয়া ব্লক এবং এই ব্লকের বিপরীতে থাকবে আরব সুন্নি দেশগুলো। যা শেষ অব্দি কিছু আরব রাষ্ট্রকে ভাঙনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ইসলামি বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করা সবসময়ই বেজায় কঠিন একটি কাজ ছিল এবং তা যে কেন সেটি খুব সহজেই অনুমেয়। ৫০টির বেশি মুসলিম দেশের মধ্যে বিদ্যমান মুখ্য অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পার্থক্য দূর করে এ দেশগুলোর ঐক্যসাধনে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক স্তম্ভ তৈরি সহজ কথা নয়। উনিশ শতকের শেষভাগ বা বিশ শতকের প্রথমভাগের তত্ত্বগুলো বর্তমানে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি
আধুনিক একটি রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর অভিজ্ঞতা রয়েছে খুবই সামান্য। একমাত্র দেশ যেটি একটি উল্লেখযোগ্য সময় ধরে ধর্মীয় নিয়ম-রীতির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে সেটি হলো ইরান।
কিন্তু ইরানী সুন্নি মুসলিমদের মুগ্ধ হওয়ার মতো বিষয়বস্তু সেখানে খুব কমই আছে। দেশটির ভেতরের বেশিরভাগ এবং বাইরের অনেক মুসলিম ইরানের অভিজাত ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীকে সমস্যা সমাধানের চেয়ে তৈরিতে বেশি পটু বলে মনে করেন।
আরেকটি উদাহরণ আফগানিস্তান। এখানে তালেবান এবং আল কায়েদার মতো চরমপন্থিরা একটি ‘আদর্শ ইসলামি রাষ্ট্র’ গঠনের সুযোগ পেয়েও ব্যর্থ হয়েছে।
প্রায় পাঁচটি বছর তালেবান এবং আল কায়েদার হাতে একটি গোটা রাষ্ট্র ছিল, তাদের যা ইচ্ছে তা করার স্বাধীনতা ছিল। ২০ বছর আগে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির রাস্তাঘাট, স্কুল, হাসপাতাল এবং কারখানা নির্মাণে অর্থ যোগানের জন্য ওসামা বিন লাদেন এবং তার অনুসারীদের পর্যাপ্ত সম্পদ ও তেল-সমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু তারা তা করেনি।
বরং তারা আফগানিস্তানকে পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। নয় এগারোর পর যা আমেরিকাকে আফগানিস্তান আক্রমণের সুযোগ করে দেয় এবং যার ফলে আরো দুর্বল হয়ে পড়ে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান। রাষ্ট্রাবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, শিগগিরিই যদি এ অঞ্চলে মৌলবাদের বিস্তার রোধ করা না যায় তবে অল্প সময়ের মধ্যে এ দেশ দুটি নিয়ন্ত্রণের অযোগ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি স্বতন্ত্র রাজ্যে পরিণত হবে।
রাজনীতি এবং ধর্মের মিশ্রণের কারণে পাকিস্তানকেও অনেক ভুগতে হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতারা ধর্মের যে ভূমিকার স্বপ্ন দেখেছিলেন ধর্ম সে ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এটি কয়েক ডজন উগ্রপন্থি ধর্মীয় গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে যারা জানে ধর্মের নামে কীভাবে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠতে হয় কিন্তু কীভাবে একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয় সে সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই।
এই উগ্রপন্থি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর জন্মের পেছনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল দেশটির সেনাবাহিনী। এখন এই সেনাবাহিনীর কাঁধেই দায়িত্ব পড়েছে উগ্রপন্থিদের বিতাড়িত করার। তারা হয়তো সফল হবে সত্যি কিন্তু পাকিস্তান রাজ্যের অভ্যন্তরেই এটি আরও বিভাজনের সৃষ্টি করবে। আর সেনাবাহিনীর এই অপারেশন যদি ব্যর্থ হয় তবে পাকিস্তানেরই কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
আধুনিক ইসলামিক রাষ্ট্র কেমন হবে?
আজকের ইসলামিক বিশ্বের আধুনিক ইসলামিক রাজ্যের সঙ্গে রাজনৈতিক ইসলামের ইসলামি রাজ্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে এখনও পর্যন্ত রাজনৈতিক ইসলাম সে পার্থক্য দূর করতে পারেনি। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক মেলবন্ধন ঘটানো যা ধীরে ধীরে খিলাফত প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর কাছে খিলাফত কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে তার কোনো সদুত্তর নেই তাদের কাছে।
ইরান, সৌদি আরব এবং মরক্কোর মতো দেশগুলোকে কি খিলাফতের অধীনে আসতে বাধ্য করা হবে? বৃহত্তর একতার স্বার্থে তারা কি তাদের সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করবে অথবা তাদের কি বাধ্য করা হবে? নতুন একটি ধর্মীয় ব্লকের উত্থানে কেমন প্রতিক্রিয়া হবে বাকি বিশ্বের? এটি কি বিশ্বের বাকি দেশগুলোর বিরুদ্ধে আরও বড় একটি জিহাদের দিকে নিয়ে যাবে?
খিলাফতের অধীনে খলিফার হাতে কতটা ক্ষমতা থাকবে এবং এর নাগরিকেরা কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করবে? ওখানে কি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকবে? টেলিভিশন ও সিনেমার পর্দায় নারীর উপস্থিতিতে কোনো বাধা আসবে কি না? একটি ইসলামি রাষ্ট্রে কি গান-বাজনার অনুমতি থাকবে? নারীদের কি পর্দা করতে বাধ্য করা হবে? পুরুষদের জন্য কি দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা হবে?
রাজনৈতিক ইসলামপন্থি নেতাদের কাছে যে এসব প্রশ্নের উত্তর নেই, তা নয়। অবশ্যই আছে। এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যাটি হলো- তাদের উত্তরটি বেশিরভাগ আধুনিক মুসলিমের কাছেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হবে না।
আধুনিক সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে অনেকগুলো মুসলিম দেশই বেশ ভালোভাবে জড়িত। দরিদ্র মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে। একে অস্বীকার করার স্পর্ধা তাদের নেই।
ধনী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর এর বিকল্প কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো ইচ্ছা বা ক্ষমতা কোনোটিই নেই। দরিদ্র মুসলিম দেশগুলোর অবস্থার পরিবর্তনে সাহায্যেও তাদের অনীহা রয়েছে।
দরিদ্র দেশগুলো থেকে যারা ধনী মুসলিম দেশগুলোতে কাজে যান তাদের সঙ্গে প্রায়ই দাসের মতো আচরণ করা হয়। ওইসব দেশ থেকে তারা একরকমের তিক্ততা নিয়ে দেশে ফেরেন যা গোটা জীবনটাই তাদের তাড়া করে ফেরে।
উদীয়মান আধুনিক মধ্যবিত্ত এবং শিক্ষিত মুসলিম নারীরা পর্দায় খুব একটা আগ্রহী নন, অন্তত মোল্লারা যেভাবে চান সেভাবে নয়। যদিও এদের অনেকেই স্কার্ফ দিয়ে মাথা ঢেকে রাখেন।
মুসলিম নারী এবং পুরুষ উভয়েরই পশ্চিমা-স্টাইলের টিভি শো, চলচ্চিত্র, গান এবং অন্যান্য সংস্কৃতির প্রতি একধরনের আসক্তি রয়েছে এবং সে আসক্তি ত্যাগ করারও খুব একটা ইচ্ছা তাদের নেই। তালেবানদের মতো অন্যান্য ধর্মীয়গোষ্ঠীগুলোর পথে হাঁটতেও তাদের আগ্রহ নেই।
আসলে আধুনিক রাষ্ট্রের জীবনযাত্রায় মুসলিমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন যে, জোরপূর্বক এদের যদি পাকিস্তানি, আফগান, সিরিয়ান অথবা আলজেরিয়ানের পরিচয় ছেঁটে ফেলে বিন লাদেন বা মোল্লা ওমরের আরোপিত পরিচয়ে পরিচিত করানোর চেষ্টা করা হয় তবে এদের অনেকেই যুদ্ধে জড়াতেও রাজি থাকবেন।
শুধু ধর্মীয়গোষ্ঠীগুলো চাচ্ছে বলেই ধনী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ভিসাপ্রথা বাতিল করে দরিদ্র মুসলিমদের জন্য তাদের দেশের দরজা উন্মুক্ত করে দেবে এমনটা ভাবা বোকামি।




