এস এম মাঈন উদ্দিন (১০ আগস্ট ২০২০)
বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিতর্ক নতুন নয়, তবে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হওয়ার ঘটনা এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে সিনহার পরিচয় এবং ঘটনার পরপরই রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে এটি বিচার বহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে এক বিরল মুহূর্ত তৈরি করে।
মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা (৩১ জুলাই ২০২০)
-
স্থান: শামলাপুর চেকপোস্ট, মেরিন ড্রাইভ, টেকনাফ, কক্সবাজার
-
ঘটনার বিবরণ:
-
ভিডিও শুটিং শেষে রাত ৯টার দিকে গাড়িতে ফিরছিলেন সিনহা ও তার সহযোগী সিফাত।
-
চেকপোস্টে পুলিশ সদস্যরা তাদের থামায়।
-
পরিচয় দেওয়ার পরও পরিদর্শক লিয়াকত আলী সিনহাকে গুলি করেন।
-
পরে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ঘটনাস্থলে এসে আরও গুলি করেন এবং সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করেন ।
-
বিচার বহির্ভূত হত্যার পরিসংখ্যান ও ধারাবাহিকতা
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে বাংলাদেশে ৪০০০-এর বেশি মানুষ বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। শুধু ২০২০ সালেই আসকের তথ্যে ২০৭ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে অধিকাংশই পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের শিকার।
আওয়ামী লীগ আমলের ২০০৯–২০২০ সাল পর্যন্ত ২,৫০০+ জন বেশী বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে বলে জানায় মানবাধিকার সংস্থা অধিকার এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
আওয়ামী আমলে বিচার বহির্ভূত হত্যার কিছু আলোচিত ঘটনা
-
অলিউল্লাহ মোল্লা (২০১৬): সাতক্ষীরায় বিএনপি নেতা, পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের উপস্থিতিতে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত।
-
নারায়ণগঞ্জ ৭ খুন (২০১৪): র্যাব সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগে ব্যাপক আলোড়ন।
-
মেজর সিনহা হত্যা (২০২০): সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশের গুলিতে নিহত, ব্যাপক বিচারিক প্রক্রিয়া।
জড়িত বাহিনী ও অভিযোগ
বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে শুধু পুলিশ বা র্যাব নয়, প্রায় সব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—যেমন যৌথবাহিনী, সেনাবাহিনী, বিজিবি, গোয়েন্দা পুলিশ, কোস্টগার্ড, আনসার ইত্যাদি।
মানবাধিকার আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, “এটা একটা সংস্কৃতি হয়ে গেছে। রাষ্ট্র চাইলে এই সংস্কৃতি বদলাতে পারে, কিন্তু সে সদিচ্ছা আমরা দেখিনি।”
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্যঃ
নিনা গোস্বামী (আইন ও সালিশ কেন্দ্র)
“বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে। কোনো সরকারই দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে, অথচ বিচার হচ্ছে না।”
সারা হোসেন (মানবাধিকার আইনজীবী)
“রাষ্ট্র যদি সিদ্ধান্ত নেয় কে খারাপ, কে মরবে—তাহলে সেটা ভয়ংকর। বিচার বহির্ভূত হত্যার কোনো যুক্তি নেই।”
মেজর সিনহার মা, নাসিমা আক্তার
“আমি সব মায়েদের প্রতিনিধি হিসেবে বলছি, যেন আর কোনো মা তার সন্তানকে এভাবে হারায় না।”
মোঃ শামসুল হক টুকু (সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী)
“আওয়ামী লীগ সরকার বিচার বহির্ভূত হত্যার সমর্থন করে না। তবে অপরাধ দমনে পুলিশের শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্র দিয়েছে।”
মোঃ হারুনুর রশীদ (বিএনপি সংসদ সদস্য)
“রাষ্ট্র চাইলে একদিনেই বিচার বহির্ভূত হত্যা বন্ধ করতে পারে। এখনই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিক—আর কোনো বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হবে না।”
মানবাধিকার কর্মীরা সবাই চান মেজর সিনহার ঘটনার পর এ সংস্কৃতি বন্ধ হোক। নিহত সিনহা রাশেদের মায়েরও দাবি আর কেউ যেন এমন হত্যাকাণ্ডের শিকার না হন। আইএসপিআরও বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে পুলিশ আস্বস্ত করেছে এটি শেষ ঘটনা এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্তু এই শেষ বলতে কি সব বিচার বহির্ভূত হত্যার শেষ বোঝাচ্ছে এ প্রশ্ন অনেকের।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি
বিচার বহির্ভূত হত্যার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত হয় না, কিংবা তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয় না। কিছু ঘটনায় যেমন নারায়ণগঞ্জে র্যাবের হাতে ৭ জন হত্যার বিচার হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ঘটনায় দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালে একরামুল হক হত্যাকাণ্ডে তার স্ত্রী অডিও প্রকাশ করে প্রতিবাদ করলেও মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।
আইনের শাসন ও ভবিষ্যৎ
মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে। শুধু সেনা কর্মকর্তার ক্ষেত্রে নয়, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও সমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
নিনা গোস্বামী বলেন, “আইন একেকজনের জন্য একেকরকম হতে পারে না। সাধারণ মানুষও বিচার চায়।”



