DMCA.com Protection Status
ADS

র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নেয়ার পর থেকে রাজধানীর চার ব্যবসায়ী নিখোঁজ:জনমনে প্রবল আতংক

image_90345_0রাজধানীর মিরপুর এলাকার জমি কেনা-বেচার ব্যবসায়ী কুদ্দুসুর রহমান চৌধুরী ও আব্দুল মজিদ। জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন তারা। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মিরপুর থেকে একে একে দুইজনই নিখোঁজ হয়েছেন। স্বজনরা এ দুই ব্যবসায়ীকে হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছেন। ঘুরছেন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে। তাদের অভিযোগ, র‌্যাব পরিচয়ের লোকজনই অপহরণ করেছে দুই ব্যবসায়ীকে। 
 
একইভাবে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা রহমত উল্লাহ সেন্টু রাজধানীর পুরান ঢাকার জনসন রোড থেকে নিখোঁজ হয়েছেন একমাস আগে। পরিবহন ও রড-সিমেন্টের ব্যবসায়ী সেন্টুর স্ত্রী লাভলী আক্তার গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ তুলেছেন, র‌্যাব পরিচয়ের লোকেরাই তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। সায়দোবাদ বাস টার্মিনালের একটি বিরোধী পক্ষের তৎপরতায় র‌্যাব ১০-এর কিছু অসাধু ব্যক্তি এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে দাবি লাভলীর। 
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওয়ালীউল্লাহ নামে মিরপুরের এক ডিশ ব্যবসায়ীও নিখোঁজ আছেন ২০ দিন ধরে। 
 
নিখোঁজ চারজনের স্বজনরা দাবি করছেন, ‘প্রশাসনের লোক’ জড়িত থাকার কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান মিলছে না। নারায়ণগঞ্জে অপহরণের পর সাতজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা চরম উৎকণ্ঠায়। 
 
তবে অভিযোগ ওঠা কোনো ঘটনার সঙ্গেই র‌্যাব জড়িত নয় বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডর এটিএম হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এসব ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবের কেউ জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখা হবে।’ 
 
এদিকে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে রাজধানীতে ক্রমেই অপহরণ আতংক বাড়ছে। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অ্যান্টি কিডন্যাপিং স্কোয়ার্ড গঠনের পর সেখানে অর্ধশতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, অপহরণের আলামত যাচাই করে প্রতিটি ঘটনারই তদন্ত চলছে। 
 
মিরপুরের জমি ও আবাসনের ব্যবসায়ী কুদ্দুসুর রহমান চৌধুরীর স্ত্রী জোসনা বেগম দৈনিক প্রথম বাংলাদেশকে বলেন, একটি গ্রুপের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ ছিল তার স্বামীর। প্রতিপক্ষ র‌্যাবের ভয় দেখায় তাদের। এরপর গত ১ জানুয়ারি রাতে মীমাংসার কথা বলে কুদ্দুসকে ডেকে নেয়া হয়। কাজীপাড়ার বাসা থেকে বের হয়ে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনে বাঙলা স্কুলের কাছে গেলে কুদ্দুসকে কালো কাচের একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেয়া হয়। অপহরণকারীরা ‘র‌্যাবের লোক’ বলে পরিচয় দিয়েছেন বলে দাবি করেন জোসনা বেগম। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন তিনি। তবে গত চার মাসেও স্বামীর কোনো হদিস মেলেনি। 
 
জানা গেছে, মামলাটি থানা থেকে ডিবি পুলিশের কাছে তদন্তের জন্য স্থানান্তর করা হয়েছে। ডিবিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার তৌহিদুর রহমান দৈনিক প্রথম বাংলাদেশকে  জানিয়েছেন, পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে কুদ্দুসুর রহমান চৌধুরীকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
 
জানা গেছে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি মিরপুরের জমি ব্যবসায়ী আবদুল মজিদকে মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনের একটি রেস্তোরাঁ থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে তার অবস্থানও খুঁজে বের করা যায়নি। ডিবির সূত্র জানিয়েছে, এ ব্যবসায়ীকে অপহরণের ঘটনাটিও তদন্ত করছেন তারা। 
 
মিরপুরের ডিশ ব্যবসায়ী ওয়ালীউল্লাহ গত ২১ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ আছেন। তার স্ত্রী রেবেকা সুলতানা দৈনিক প্রথম বাংলাদেশকে  জানান, মিরপুর-১৩ নম্বর সেকশনের নয় নম্বর লাইনের ৪৫ নম্বর ভবনে থাকেন তারা। ২১ এপ্রিল রাতে ওয়ালীউল্লাহ বাসার অদূরে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় কালো কাচ লাগানো একটি সাদা মাইক্রোবাস তার পাশে এসে থামে। গাড়ি থেকে দু’জন নেমে ওয়ালীউল্লাহকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ব্যবসায়ীক বিরোধের জের ধরে কেউ অপহরণের ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে বলেও ধারনা করছেন অপহৃতের স্ত্রী।
 
পুরান ঢাকা থেকে অপহৃত ব্যবসায়ী সেন্টুর স্ত্রী লাভলী আক্তার দৈনিক প্রথম বাংলাদেশকে  জানান, তার স্বামী সায়েদাবাদ-টঙ্গী রোডে চলাচলকারী তুরাগ পরিবহনের ভাইস চেয়ারম্যান। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়ে তার রড-সিমেন্টের ব্যবসাও আছে। তিনি পরিবার নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়ের নিজ বাড়িতে থাকতেন। 
 
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লাভলী বলেন, গত ৯ এপ্রিল তিনি ও সেন্টু একটি মামলার বিষয়ে আলোচনার জন্য আদালতপাড়ার আইনজীবীর সহকারী শাহ আলমের চেম্বারে যান। আলোচনা শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা দুইজন চেম্বার থেকে বের হন। এ সময় ৮/১০ জন লোক তার স্বামীকে জোর করে ইংলিশ রোডের দিকে নিয়ে যেতে থাকেন। ওই সময় তিনি ও তার স্বামীর চিৎকারে আশপাশের দোকানিরা এগিয়ে আসেন। যারা সেন্টুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এক পর্যায়ে তারা তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে রাস্তার মুখে অপেক্ষারত ঘিরে রঙের মাইক্রোবাসে তোলে। মাইক্রোবাসটিতে কালো কাচ লাগানো ছিল। উপস্থিত লোকজন মাইক্রোবাসটি আটকানোর চেষ্টা করেন। তখন র‌্যাবের পোশাক পরা অস্ত্রধারী তিন-চারজন লোক এসে জড়ো হওয়া লোকদের লাঠিপেটা করে মাইক্রোবাসের সামনে থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর র‌্যাবের আরেকটি গাড়ি আসে। তখন গাড়িগুলো চলে যায়। 
 
লাভলী আক্তার বলেন, পাশেই থাকা পুলিশ সদস্যরা তাকে জানায়, ধরে নেওয়া লোকজন র‌্যাব-১০ এর সদস্য। তারা পরিচয়পত্রও দেখিয়েছেন। এরপর লাভলী র‌্যাব-১০ এর কার্যালয়ে গেলে র‌্যাব তার স্বামীকে আটকের কথা অস্বীকার করে। এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় ১৬ এপ্রিল একটি অপহরণ মামলা করেন লাভলী আক্তার। তিনি অভিযোগ করেন, ব্যবসায়িক বিরোধের জের ধরে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের সাইফুল ইসলাম মাহমুদ ও টার্মিনালের কর্মচারী বাবুর যোগসাজশে র‌্যাব-১০ এর সদস্যরা তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় আইনজীবীর সহকারী শাহ আলমের যোগসূত্র আছে বলেও অভিযোগ তার। এসব অভিযোগ তুলে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন লাভলী আক্তার। 
 
শুক্রবার তিনি দৈনিক প্রথম বাংলাদেশকে বলেন, থানায় মামলা করার পরও কোনো তদন্ত হয়নি। অ্যান্টি কিডন্যাপিং স্কোয়াডে যোগাযোগ করেছি। তারা বলছে, আমরা অভিযোগটি খতিয়ে দেখবো। 
 
অ্যান্টি কিডন্যাপিং স্কোয়ার্ডে অর্ধশত অভিযোগ:
ডিবির সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি অপহরণ আতংক বেড়ে যাওয়ায় গঠন করা অ্যান্টি কিডন্যাপিং স্কোয়াডে এখন পর্যন্ত অর্ধশত অভিযোগ এসেছে। তবে বেশিরভাগ অভিযোগ পরে আর ভিত্তি থাকছে না। সাত দিনে আসা কয়েকটি ঘটনার তদন্ত করছে ডিবির দল। তবে বেশিরভাগ ঘটনা বা অভিযোগ স্কোয়াড গঠনের আগের। নতুন পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি ঘটনায় অপহৃতদের উদ্ধার করা হয়েছে। আরও একজনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
 
স্কোয়াডের প্রধান ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ছানোয়ার হোসেন দৈনিক প্রথম বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা অপহরণ প্রতিরোধে সতর্কতামূলক নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। পাশাপাশি পুরনো অভিযোগগুলোও তদন্ত করা হচ্ছে।’ 
তিনি আরও বলেন, ‘সাময়িক ফোন বন্ধ থাকা বা বাসায় ফিরতে দেরি হলে উৎকণ্ঠার কারণ নেই।’ তবে সন্দেহ হলে নিকটস্ত থানা বা অ্যান্টি কিডন্যাপিং স্কোয়াডে তথ্য জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। স্কোয়াডের নম্বরগুলো হলো: ০১৭১৩৩৯৮৩২৭ (হটলাইন) ০১৭১৩৩৯৮৬১৯, ০১৭১৩৩৭৩২১৪, ০১৭১৩৩৭৩২১৬।
 

Share this post

scroll to top
error: Content is protected !!