বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার

ক্যাপ্টেন(অবঃ) মারুফ রাজুঃ বিগত ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের আমলে (২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল) বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। আর পাচার হওয়া এসব অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানান তিনি। তারেক রহমান বলেন, দেশে-বিদেশে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ (ফ্রিজিং) করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা)। পাচার করা এ অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। 

মামলার হালনাগাদ তথ্য জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ছয়টি মামলার রায় দেওয়া হয়। তারেক রহমান আরও উলে­খ করেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বুধবার জাতীয় সংসদে মো. আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। প্রশ্নোত্তর পর্বের প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ছিল।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, এটি জনগণের অর্থ। যেহেতু আমরা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকার, জনগণের প্রতি এবং দেশের প্রতি আমাদের একটি দায়বদ্ধতা আছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই জনগণের অর্থ ফিরিয়ে এনে জনগণের জন্য এবং দেশের কল্যাণে ব্যয় করা এই সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, যে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জনগণের অর্থ ফেরত আসবে, আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন এই সরকার সেই পদক্ষেপই গ্রহণ করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসাবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চীনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দেশ- মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ সইয়ের বিষয়ে সম্মতি মিলেছে। বাকি সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্সের চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া চলমান। মামলাগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে এবং পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল ও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়।

সম্পদ জব্দের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আদালত দেশে মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অপরদিকে আদালতের নির্দেশে বিদেশে মোট ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। 

পরবর্তী সময়ে রাজশাহীর সংসদ-সদস্য মুজিবুর রহমানের অপর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী অর্থ পাচারকারীদের তালিকা প্রণয়ন ও বিচারের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেন। পাচারকারীদের তালিকা তৈরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই অন্যায়ের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের তালিকা করার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ রয়েছে, তারাই এই তালিকা তৈরি করছে।

প্রধানমন্ত্রী বিগত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান সরকার একটি নির্বাচিত সরকার। আমরা অতীতে দেখেছি সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের ইচ্ছা-আগ্রহের কারণে দেশের আইনকানুন, নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে যাকে যখন ইচ্ছা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। যার কাছ থেকে যা মনে হয়েছে, জোর করে লিখিয়ে নিয়েছে। বর্তমান সরকারের আইনি কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা দেশের প্রচলিত আইন মেনে কাজ করতে চাই এবং আইনের ভিত্তিতেই বিচার করতে চাই, যাতে কোনো মানুষ ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত না হন। আইনগতভাবেই আমরা সব প্রক্রিয়া গ্রহণ করব। আইন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ীই এ দেশের জনগণের অর্থ তছরুপকারী বা অর্থ পাচারকারীদের শাস্তি নির্ধারিত হবে।

প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত ১১টি অগ্রাধিকারভুক্ত মামলাগুলো হচ্ছে- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবার ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান; সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান; এস আলম গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান; বেক্সিমকো গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান; সিকদার গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/ প্রতিষ্ঠান; নাসা গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান; ওরিয়ন গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান; নাবিল গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান; এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবার ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান এবং সামিট গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান।

এসব মামলার অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদালত এ পর্যন্ত (২৫ মার্চ) ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করেছেন। এর মধ্যে দেশে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ। পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় দেওয়া হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডে পরিবারের সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে: এবিএম মোশাররফ হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড পরিবারের সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। এ কার্ড পরিবারের নারী প্রধানকে প্রদান করা হবে। ফলে এই সহায়তাটি যেমন সরাসরি পরিবারের সদস্যদের খাদ্য, পুষ্টি, জরুরি চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যয় হবে, অন্যদিকে ফ্যামিলি কার্ডটি পরিবারে নারী প্রধানের নামে হওয়ায় পরিবারের সম্পদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবারে সিদ্ধান্ত প্রদান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। পরিবার ও সমাজের ওপর নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে।

একই সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১০ মার্চ দেশের ১৩টি জেলার ৩টি করপোরেশন/ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারী প্রধান পরিবারকে ভাতা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাকি ৩ মাসে আরও ৩০ হাজার পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। আগামী ৪ বছরের মধ্যে চার কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে।

তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার দেশের মানুষকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের প্রাথমিক কাজ শুরু করা হয়েছে। নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের মাধ্যমে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে সব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। আমরা যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছি সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে তা পালনের চেষ্টা অব্যাহত রাখব।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কার্ডের বাজেট বরাদ্দ সম্পর্কে জাতীয় নাগরিক পার্টির আখতার হোসেনের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ খাতে কত বাজেট তা এখনই বলছি না। পর্যায়ক্রমে এ জিনিসগুলো আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব। কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড যারা পাবেন তারা মাসে আড়াই হাজার টাকা পাবেন। একবারে আমরা সবাইকে দেব না। পৃথিবীর কোনো দেশের পক্ষে একবারে সবাইকে দেওয়া সম্ভবও নয়। আমরা পর্যায়ক্রমে প্রতিমাসে উপভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকব। প্রতিবছরই আমরা বাজেটে বরাদ্দ বাড়াব। এভাবে ধীরে ধীরে আমরা এগোব। আর আমরা টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না যে, মূল্যস্ফীতি হবে। কাজেই মূল্যস্ফীতি হবে না বরং এই টাকা আমরা যাদের দেব- সেইসব কৃষক ও নারী নিশ্চয়ই সিঙ্গাপুর বা বিভিন্ন দেশে পাচার করবেন না। এই টাকা স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যয় হবে। এতে করে লোকাল অর্থনীতি বিনিময় হয়ে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। আমাদের কোনো গবেষণা বলছে না মূল্যস্ফীতি হবে। বরং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। প্রান্তিক গোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হবে।

সংসদে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী: তাহসিনা রুশদীরের এক প্রশ্নের জবাবে সরকারের ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে ইশতেহার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে অর্জিত উলে­খযোগ্য অগ্রগতিও দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নের জন্য সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে উলে­খযোগ্য অগ্রগতিও অর্জিত হয়েছে।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের খাতভিত্তিক চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারীপ্রধান পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা প্রদানে সরকার কৃষক কার্ড প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে এটি পাইলটিং করা হবে। এছাড়া, নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার ইতোমধ্যে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রাথমিক পর্যায়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পূর্বেই ৯ হাজার ১০২ জন উপকারভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সম্মানি পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৯৫ জন ইমাম, ২ হাজার ৯৭৫ জন মুয়াজ্জিন, ২ হাজার ৬০৪ জন খাদেম এবং হিন্দু মন্দিরের ১১৪ জন পুরোহিত, ৮৩ জন সেবাইত এবং বৌদ্ধ বিহার/প্যাগোডার ১৫ জন অধ্যক্ষ ও ১৬ জন উপাধ্যক্ষ রয়েছেন।

লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরও যা জানান-

ই-হেলথ কার্ড ও স্কুল ড্রেস : খুলনা জেলায় পাইলটিং কার্যক্রমের আওতায় ২৫ লাখ ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া, চলতি অর্থবছরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

২০ হাজার কিমি. খাল খনন ও বনায়ন : আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি ১৬ মার্চ থেকে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খনন করেছে। এছাড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কাবিখা, কাবিটা ও টিআরের মাধ্যমে আরও ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন বা সংস্কার করবে। পাশাপাশি, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দেড় কোটি চারা উৎপাদন করা হয়েছে, যা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রোপণ করা হবে।

শিক্ষায় প্রযুক্তি ও ভাষা দক্ষতা : কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব প্রদান করা হবে এবং ৩ হাজার ৮৩২টি মালটিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে। ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে ইটালিয়ান ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষা প্রদান করা হবে। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ৪১৮টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

খেলার মাঠ ও ক্রীড়া ভাতা : সারা দেশে শহর ও গ্রাম অঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কর্মকৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া, ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ‘ক্রীড়া ভাতা’ চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে এই ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে প্রথম ধাপে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনকারী ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে।

পেপ্যাল চালু ও হাইটেক পার্ক : হাইটেক বা সফটওয়্যার পার্ক এবং আইসিটি সেন্টারগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এবং বাংলাদেশে পেপ্যালের কার্যক্রম আরম্ভে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি : ল্যাংগুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় বিদ্যমান জামানতবিহীন ঋণ সীমা ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। জাপানগামী শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির পূর্বেই ‘সার্টিফিকেট অব এলিজিবিলিটি’র ভিত্তিতে এই ঋণ প্রদান সহজ করা হয়েছে। 

কুড়িগ্রামে ভুটানের অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে : আতিকুর রহমান মোজাহিদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কুড়িগ্রামে ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) ভিত্তিতে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পাশাপাশি এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকায় ১৩৩ একর জমির মালিকানাও পেয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।

ভুটানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অগ্রগতি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ২০২৩ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে ভুটানের রাজা কুড়িগ্রামে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে, ভুটানি বিনিয়োগকারীদের জন্য সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভুটান সরকারের যোগাযোগ শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় বেজা কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার মাধবরাম মৌজায় ‘কুড়িগ্রাম অর্থনৈতিক অঞ্চল-১’ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরে ভুটানের রাজার আগ্রহের ভিত্তিতে জিটুজি যৌথ উদ্যোগের অধীনে বেজা উক্ত স্থানে একটি ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে।

জমি অধিগ্রহণের অগ্রগতি সম্পর্কে সংসদ নেতা জানান, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠার জন্য বেজার অনুকূলে ১৫০.০৭ একর খাসজমি এবং ৬৯.৫৭ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি বরাদ্দ বা অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত বেজা ওই মৌজায় ১৩৩.৯২ একর জমির মালিকানা লাভ করেছে। এছাড়া, একই মৌজায় আরও ৬১.৮৭ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। 

Share this post

scroll to top