বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নাম, যিনি জনগণের ভালোবাসা ও আস্থার প্রতীক হয়ে আছেন। ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন লোভলালসার ঊর্ধ্বে উঠে, যা তাঁকে জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। জনগণ তাঁর মাঝে দেখেছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি, যিনি এক দশক আগে চক্রান্তকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে দেশ ছাড়ার হুমকি দিলে তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দেন, দেশের বাইরে তাঁর কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশই তাঁর একমাত্র আশ্রয়। সেই দৃঢ়তা জনগণের হৃদয়ে তাঁকে স্থায়ী করে দিয়েছে।
বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন। এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতির খবর দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নিউমোনিয়ার কারণে বুকে জমে থাকা কফ পরিষ্কার হচ্ছে বলে চিকিৎসকরা আশার কথা জানিয়েছেন, তবে হৃদযন্ত্র, লিভার, কিডনি ও ফুসফুসের জটিলতা কাটছে না। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। জনগণ তাঁর রোগমুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া করছে, যা প্রমাণ করে তিনি কতটা মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তাঁর একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি নিয়ে নানা গুঞ্জন থাকলেও সরকার জানিয়েছে, তাঁর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এসএসএফের নিরাপত্তা তাঁকে দেওয়া হতে পারে, যা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিরা পান। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শতভাগ নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। রাজীব গান্ধীর ওপর শ্রীলঙ্কায় আক্রমণ কিংবা ১৯৮৩ সালে ফিলিপাইনে বেনিগনো অ্যাকুইনোর হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, নিরাপত্তার ঘেরাটোপও কখনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে প্রতিটি সম্ভাব্য ঝুঁকি দূর করা জরুরি।
বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় ইস্যু—বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা, তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনগণের প্রত্যাশা একটাই, তা যেন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। কিন্তু আশঙ্কা রয়েছে, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো নাশকতামূলক তৎপরতা চালাতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আগেভাগেই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কোনো অঘটন ঘটতে না পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটতে সময় লাগে না, চোখের পলকে অঘটন ঘটে যায়। তাই নির্বাচনকে ঘিরে কোনো অস্থিতিশীলতা যেন সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। জনগণ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা, তারেক রহমানের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা যেমন প্রবল, তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নিরাপত্তা বলয়েও রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলা হয়েছে। রাজীব গান্ধী কিংবা বেনিগনো অ্যাকুইনোর হত্যাকাণ্ড সেই শিক্ষা দেয়। তাই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং জাতীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
তারেক রহমানের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিশ্চিত করা কেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে
রাজনৈতিক অবস্থান ও গুরুত্ব
-
তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বেগম খালেদা জিয়ার একমাত্র জীবিত সন্তান।
-
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি দলের প্রধান কৌশল নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত।
-
তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি জনগণ ও মিডিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
জনসমর্থন ও বিরোধিতা
-
দেশে তাঁর বিপুল সংখ্যক অনুরাগী রয়েছে, যারা তাঁকে নেতৃত্বে দেখতে চায়।
-
একইসঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্বেষী ও প্রতিপক্ষ শক্তিও সক্রিয়, যারা রাজনৈতিকভাবে তাঁকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
-
এই দ্বিমুখী পরিস্থিতি তাঁকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ইতিহাসের শিক্ষা
-
ইতিহাসে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়েও রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলা হয়েছে।
-
১৯৮৭ সালে শ্রীলঙ্কায় রাজীব গান্ধীর ওপর আক্রমণ।
-
১৯৮৩ সালে ফিলিপাইনে বেনিগনো অ্যাকুইনোকে হত্যা।
-
-
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, নিরাপত্তা কখনো শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
-
দেশে অবৈধ অস্ত্র, স্নাইপার গান ও পেশাদার খুনিদের উপস্থিতি নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায়।
-
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নাশকতার আশঙ্কা থাকে।
-
সরকার জানিয়েছে, তারেক রহমান দেশে ফিরলে তাঁকে এসএসএফ (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) নিরাপত্তা দেওয়া হতে পারে, যা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিরা পান।
জনগণের প্রত্যাশা
-
জনগণ চায় তিনি নিরাপদে দেশে ফিরে নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনা করুন।
-
তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নির্বাচন অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে, যা কারও কাম্য নয়।
লেখকঃ লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাংবাদিক-কলামিস্ট ক্যাপ্টেন (অবঃ) মারুফ রাজু ( প্রথম বাংলাদেশ )




