ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সাতই নভেম্বরঃ এম হামিদুল্লাহ খান, বীরপ্রতীক

mrsumon007_1322049419_1-akandablog_1182547587_1-Ziaur_Rahman15ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সাতই নভেম্বর

-এম হামিদুল্লাহ খান, বীরপ্রতীক




৭ নভেম্বরের বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মহান দিন-‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’। বাংলাদেশের ইতিহাসে সিপাহি-জনতার এক অভূতপূর্ব ঐক্যের মধ্য দিয়ে এই দিন জাতীয় জীবনে সূচিত হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। দেশপ্রেম ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদের নিখাদ অনুপ্রেরণারই জন্মদিন ছিল এই দিন।

 
এই দিনের তাৎপর্য বর্ণনার আগে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা না বললেই নয়। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ আওয়ামী লীগেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী তথা খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের অনেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং ওই নেতার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দু’জন সামরিক অফিসার যথা মেজর রশীদ ও মেজর ফারুক, যারা উভয়ই উভয়ের ভায়রা ভাইও বটে, সাথে কিছুসংখ্যক সামরিক অফিসার যাদের শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে কলমের এক খোঁচায় চাকুরিচ্যুত করেছিলেন, তাদেরই নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমান তার স্ত্রী-পুত্র, পুত্রবধূ এবং অন্য আত্মীয়-স্বজনসহ ওই অফিসারদের হিংস্র আক্রোশে প্রাণ দিয়েছিলেন। মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করেছিলেন; কিন্তু ক্ষমতা রয়ে গিয়েছিল ওই মেজরদেরই হাতে। মোশতাক আহমদ নামে মাত্র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মেজরদের শাসন তৎকালীন আর্মি চিফ অব জেনারেল স্টাফ বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ মেনে নিতে রাজি হননি এবং এটা কোনো গোপন বিষয় ছিল না।

আমি দুয়েক দিন পরপরই ৪৬ বিগ্রেড কমান্ড হেড কোয়ার্টারে যেতাম। যেহেতু আমি এয়ারফোর্সের একজন সিনিয়র অফিসারও ছিলাম এবং যেহেতু বিমান বাহিনী এ ধরনের অভ্যুত্থানের অংশ না নেয়, তাই আমাকে সবাই সমীহ করতেন। ৪৬ বিগ্রেডের কমান্ডারসহ প্রায় সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ নিজেও ঘন ঘন ৪৬ বিগ্রেডে আসতেন। আমার সাথে পূর্বহৃদ্যতার কারণে যথেষ্ট আপন হয়ে কথাবার্তা বলতেন। তার বক্তব্য ছিল চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করে গুটিকয়েক মেজর দেশ পরিচালনা করবে এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ফারুক, রশীদ, ডালিম তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেও ক্যান্টনমেন্টকে তাদের তাঁবে আনতে বিফল হন। সিজিএস খালেদ মোশাররফ এক মাস অতিবাহিত হতে না হতেই প্রায় প্রতিদিনই ক্যান্টনমেন্টে থাকা ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যানবাহন এবং এপিসি (আরমার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার) এবং পদাতিক সেনাদের নিয়ে নৈশ মহড়ায় বের হতেন। উদ্দেশ্য বিদ্রোহী মেজরদের কাছে সশস্ত্র বার্তা পাঠানো। মেজররা তাদের ট্যাঙ্ক বাহিনী নিয়ে বঙ্গভবন এবং রেসকোর্স ময়দানে অবস্থান নিয়েছিলেন।

এরই মধ্যে খালেদ মোশাররফের দূতের সাথে তাদের একটি সংলাপ শুরু হয়ে যায়। মেজরেরাও বুঝতে পারে যে, এভাবে বেশি দিন টিকে থাকা সম্ভবপর নয়। অবশেষে ৩ নভেম্বর মেজরেরা তাদের পরিবারসহ বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংক থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ সম্পদ বিদেশী মুদ্রা নিয়ে একটি প্লেনে করে ব্যাংকক চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তে সম্মত হয়।

ইতোমধ্যে চার নেতাকে মোশতাকের নির্দেশে জেলের ভেতরে হত্যা করা হয়। জেনারেল জিয়াকে নিরাপত্তার অজুহাতে গৃহবন্দী করা হয়। মোশতাককে বঙ্গভবনের একটি কক্ষে বন্দী করা হয়। প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোঃ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। ৪ নভেম্বর থেকে খালেদ মোশাররফ বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন।

ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই তিনি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। ঠিক সেই সময়ই একটি তৃতীয় শক্তির উদ্ভব ঘটে। এটা ছিল জাসদের সশস্ত্র ক্যাডার প্রধান কর্নেল তাহের। তিনি ঢাকাসহ সব ক্যান্টনমেন্টে ও ইপিআরে প্রচারপত্র বিলি করেন। প্রচারপত্রের মূল কথা ছিল ‘সিপাহি জনতা ভাই ভাই অফিসারের রক্ত চাই’, ৭ নভেম্বরের আগেই এই হ্যান্ডবিল ব্যাপক প্রচার লাভ করে। ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ অলৌকিকভাবে আরেকটি কাউন্টার অভ্যুত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে যায়।

তাদের মধ্যে এই প্রতীতি জন্মে যে, খালেদ মোশাররফ ভারতীয় অ্যাজেন্ট। কেননা, এর আগের দিন খালেদ মোশাররফের ভাই রাশেদ মোশাররফ এবং তাদের মায়ের নেতৃত্বে ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে মিছিল করা হয় এবং সে মিছিলে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধ’ শ্লোগান ওঠে এবং খালেদ মোশাররফকে অভিনন্দন জানায়।

৭ নভেম্বর ভোর রাতে কর্নেল তাহের জিয়াকে মুক্ত করে আনার উসিলায় কিছু সেনা এবং অফিসার সেখানে পাঠায়। কর্নেল তাহের যেহেতু মার্কসবাদ-লেলিনবাদ তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন, যে কারণে প্রথমেই তারা জিয়াকে খতম করার জন্য ওই গ্রুপটিকে পাঠিয়েছিল। ওই গ্রুপটি ৬ নম্বর মঈনুল রোডে গিয়ে দেখে যে, জিয়াকে অন্য একটি গ্রুপ ইতোমধ্যেই মুক্ত করে নিয়ে গেছে।

এই গ্রুপটি ছিল সিপাহিদের মধ্যে ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক সিপাহিরা। হাজার হাজার সেনা যারা ছিল সংখ্যায় অনেক বেশি, তারা জিপ, লরি ও ট্রাকে করে জিয়াকে কাঁধে করে নিয়ে মুহুর্মুহু ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে উল্লাস ও মিছিল করছিল। তারা আকাশে ফাঁকা গুলি করতে করতে জিয়াকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। দেশকে রক্ষার জন্য জিয়ার দ্বিতীয়বার অভ্যুদয় ঘটল। তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে রেডিওতে জাতির উদ্দেশে বলেছিলেন, সিপাহি-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থানে সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে কেউই নস্যাৎ করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।

আপনারা নিঃসঙ্কোচে যার যার কাজে যোগ দিন। বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো আধিপত্যবাদী আগ্রাসী শত্রুর কবলমুক্ত হয়ে আপন মহিমায় জ্বলে উঠল। ইতোমধ্যে বিপ্লবী সিপাহিরা জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা, কর্নেল হায়দার, আবু ওসমান চৌধুরীর স্ত্রী, একজন মেজর (ডেন্টিস্ট) এবং একজন মহিলা ডাক্তারসহ অনেক অফিসারকে হত্যা করে ফেলে। তাহের গোপনে গা ঢাকা দেয়। জিয়া অত্যন্ত কড়া ভাষায় সব হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন।

দেশাত্মবোধের নিখাদ অনুপ্রেরণায়ই জন্ম দিয়েছিল পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের এই তারিখটি। আমরা জানি, একটি জাতির জীবনে এমন একটি সময় আসে যখন ইতিহাস তার অনিবার্য নিয়মেই পালা বদল করে। রূপান্তর ঘটায় তার জীর্ণ, মরচেধরা সমাজের এবং জন্ম দেয় নতুন ইতিহাসের। কিন্তু এ নতুন প্রভাতের অভ্যুদয়ের প্রত্যাশায় তাকে অপেক্ষা করতে হয় একটি সঠিক মুহূর্ত কিংবা একটি যুগ সন্ধিক্ষণের জন্য, সেই মুহূর্তটি যখন এসে যায়, আপনা থেকেই ইতিহাস তার অন্তর্নিহিত শক্তির পুনর্জাগরণ ঘটিয়ে সব বিপরীত স্রোতের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়।

ইতিহাসের সেই অগ্নিঝরা শক্তি স্ফুলিঙ্গে পরিণত হয় জাতির প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি সন্তান। এই মহাজাগরণ এবং তার ঐক্যের অবিনাশী শক্তির সামনে টিকতে পারে না কোনো বিভেদাত্মক শক্তি। আপন অমিত তেজেই জয়যুক্ত হয় দেশাত্মবোধ ও জাতীয় ঐক্যের মহিমান্বিত শক্তি। সে সাথে প্রতিষ্ঠা ঘটে ইতিহাসের শাশ্বত সত্যের।

একাত্তরের ২৫ মার্চ ইতিহাসের এই মহাজাগরণ এবং তার ঐক্যবদ্ধ শক্তির এক বিশাল অভ্যুদয়ের লক্ষ করেছি আমরা। তার পথ বেয়ে এসেছে স্বাধীনতা। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন ছিল যেমন একটি সন্ধিক্ষণের, তেমনি একটি পটভূমির। বহু যুগের অবক্ষয়, বঞ্চনা ও হতাশা পুঞ্জীভূত হয়ে নির্মাণ করেছিল ইতিহাসের সেই পটভূমিটি এবং যখন সব ক্ষোভ এর ভিত্তিমূলকে উত্তপ্ত করে দিয়ে দাবানল হয়ে জ্বলে উঠতে শুরু করল তখনই আমরা দেখি গোটা জাতিকে অখণ্ড পর্বতের মতো একক সত্তায় মিলিত হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে।

জাতি তথা সর্বস্তরের মানুষের এই যে মিলন এর নামই তো জাতীয় ঐক্য, জাতীয় সংহতি ও একাগ্রতা। এর ভাষা এক, অনুপ্রেরণার উৎস এক, লক্ষ্য অভিন্ন। ২৫ মার্চের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে স্বাধীনতার উন্মেষের মধ্য দিয়ে আমরা দেখেছি এই ঐক্যের প্রথম জাগরণ। কিন্তু স্বাধীনতা এলেও তাকে সংহত করার জন্য আরো সংগ্রাম এবং আরো অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল হীনম্মন্যতা পরাশ্রয়ী আর অশুভ প্রভাবের আবর্ত থেকে উঠে এসে আপন ইতিহাস ও জাতীয়তার স্বরূপ নির্ণয়ের। সেই সাথে অনিবার্য হয়ে পড়েছিল আত্মসত্তা আর আত্মশক্তির উদ্বোধনের। স্বাধীনতার সেই অসমাপ্ত প্রক্রিয়াকে একটি পরিণত রূপ দেয়ার প্রয়োজনেই অনিবার্য হয়ে উঠেছিল ৭ নভেম্বরের আবির্ভাব।

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top