DMCA.com Protection Status
ADS

আজ ঐতিহাসিক ৪ঠা এপ্রিলঃ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখা পরিস্ফুট হবার দিন

1510911_650475134989366_1112341054_nসাইদুল ইসলামঃ হবিগঞ্জ জেলার পূর্ব প্রান্তে ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী একটি ছোট্ট গ্রাম তেলিয়াপাড়া। সিলেট হবিগঞ্জ রেল পথে ইটাখোলা রেলস্টেশন থেকে মেঠো পথে ৩০ মিনিটের দূরত্বে গত শতাব্দীর প্রথম ভাগে মাত্র ২৩ ঘর চা বাগানের শ্রমিক নিয়ে গড়ে ঊঠেছিল এই গ্রামটি। ১৯৭১ সালের আগে মাত্র একবারই উল্লেখ করার মত একটি ঘটনা ঘটেছিল এই গ্রামে। ব্রিটিশদের কাছ থেকে মালিকানা পাওয়া এ, এন মুখোপাধ্যায় বাগানটি আনোয়ার হোসেন নামের একজন বাঙালি মুসলমানের কাছে বিক্রি করে দিয়ে ভারতে চলে যান ১৯৬৫ সালে। ততদিনে বাগানের কলেবর বেড়েছে, শ্রমিকের সংখ্যা, বেড়েছে তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয়নি। একটি চা বাগান, একটি ক্ষীণকায় পাহাড়ি নালা আর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে গড়া নির্জন গ্রামটি হঠাৎ করেই কোলাহল মুখোরিত হয়ে পড়ে ১৯৭১ সালের এপ্রিলের ২ তারিখে তেলিয়াপাড়া চা বাগানে হেড কোয়ার্টার স্থাপন করেন ২য় ইস্টবেঙ্গলের সহ অধিনায়ক মেজর সফিউল্লাহ।" তার দু'দিন পর ১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিল এখানে অনুষ্ঠিত হয় মুক্তি যুদ্ধের সেনা নায়কদের প্রথম সম্মেলন। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য অনেক ঘটনার মত এই সম্মেলনটিও তেমন কোন পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়। তবে সম্মেলন শেষ হয় দেশ স্বাধীন হবার আগ পর্যন্ত সরবাত্নক লড়াইয়ের পরিকল্পনা নিয়ে।
একথা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে ৭০ এর নির্বাচনে বিজয়ের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর ছলচাতুরী, ছাত্র সমাজের সশস্ত্র আন্দোলনের মহড়া এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালির
10156144_650476584989221_427795353_nস্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে দিলেও লড়াই করে বিজয় অর্জনের প্রস্তুতি ছিল অপ্রতুল। উনসত্তরের গণ অভ্যূত্থানের সাফল্য, দলের বুর্জোয়া চরিত্র এবং নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উপর বিশ্বাস এক্ষেত্রে আওয়ামীলীগের যুদ্ধ প্রস্তুতির প্রধান প্রতিবন্ধক হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। ৭ই মার্চের ভাষণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি ইউনিট গুলিকে উদ্দীপ্ত করলেও যুদ্ধারম্ভের আহ্বান সেখানে স্পষ্ট হয়নি। ফলতঃ এই ইউনিট গুলির যুথবদ্ধতা নষ্ট করার জন্যে মহড়া এবং আইন শৃংখলা রক্ষার অজুহাতে সেনানিবাসের বাইরে পাঠাতে পাকিস্তান সেনা নেতৃত্বের তেমন কোন বেগ পোহাতে হয়নি। অপারেশন সার্চ লাইটের নামে পাকিস্তান বাহিনীর নজির বিহীন হত্যাযজ্ঞই মূলতঃ বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্যে অকুতোভয় করে তোলে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের প্রায় সাথে সাথেই বাঙালি সতঃস্ফূরত ভাবে এর জবাব দিতে শুরু করে। ৭ই মার্চের ভাষণ সেখানে যতটা প্রেরণা হিসাবে কাজ করে, বাঙালির আত্মরক্ষার মরীয়া চেষ্টা তার চেয়ে বড় অনুঘটক হিসাবে প্রতিভাত হয়। সেনাবাহিনীর বাঙালি ইউনিট এবং ইপিআরের ব্যাটালিয়নগুলি বিভিন্ন সেনানিবাস ও শহরে বিচ্ছিন্ন ভাবে বিদ্রোহ করে। এই ইউনিট গুলির মধ্যে পারস্পারিক যোগাযোগ না থাকায় বিদ্রোহের প্রথম কয়েকদিন লেগে যায় খোঁজ খবর সংগ্রহে। মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল, এবং ক্যাপ্টেন রফিকের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের ইপিআর ২৫ মার্চ রাতেই বিদ্রোহ করলেও সে খবর তখনও খালেদ মোশাররফের কাছে পৌছেনি। অন্যদিকে মেজর সফিউল্লাহ ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে ২৮ মার্চ বিদ্রোহ করলেও এর আগের দিন সঙ্ঘটিত ৪র্থ ইস্টবেঙ্গলের বিদ্রোহের কথা জানতে পারেননি। ২৯ তারিখে খালেদ মোশাররফ, সফিউল্লাহ’র বিদ্রোহ এবং ঢাকা আক্রমণের জন্যে কিশোরগঞ্জে ২য় বেঙ্গলকে সংগঠিত করার খবর পান। ঢাকায় পাকিস্তানি ২টি ব্রিগেড সহ প্রচুর সৈন্য মোতায়েন থাকায় খালেদ, সফিউল্লাহ কে ঢাকা আক্রমণের পরিবর্তে সিলেটে এসে নিজ বাহিনীকে সংগঠিত করার জন্যে অনুরোধ করেন। কিশোরগঞ্জের সাথে যোগাযোগের তেমন কোন ব্যবস্থা না থাকায় তিনি একটি চিঠি দিয়ে লেঃ মাহবুব কে সফিউল্লার উদ্দেশ্যে পাঠান। অন্য কোন বাহন না থাকায় মাহবুব কে যেতে হয় রেলের ইঞ্জিনে চেপে। তিনি চিঠিতে লেখেন Do not go towards Dacca. You will be banging your head against wall. We have liberated an area whole of Brahmanbaria Subdivision and a part of Sylhet. Before taking any further action on Dacca, we 10156144_650476584989221_427795353_n 10171771_650475731655973_964559707_nshould jointly liberate this whole area and then go for Dacca. I had already contacted Indian BSF officers and they have agreed to help us. I could not come and meet you today because I am going to meet Brigadier B.C. Pandey of BSF who promised me to help us.
খালেদের পরামর্শ অনুযায়ী সফিউল্লাহ ব্রাহ্মনবাড়িয়া হয়ে তেলিয়া পাড়া পৌঁছেন এবং ৩ এপ্রিল তেলয়াপাড়ায় তাঁর হেড কোয়ার্টার স্থাপন করেন। ইতমধ্যে চট্টগ্রামের বিদ্রোহ, কালুরঘাটের ঘোষণা এবং কুস্টিয়ার যুদ্ধের খবর তেলিয়াপাড়া পৌঁছে। ফলে সামগ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সমর নায়কদের কাছে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। যুদ্ধের গতিময়তা এবং এই ন্যায় যুদ্ধের বৈধতা দেবার জন্যে নেতৃত্বের বিষয়টি তাদের কাছে জরুরী হয়ে পড়ে। ২ এপ্রিল কুমিল্লার মতি নগরের কাছে খালেদের সাথে কর্নেল ওসমানী ও লেঃ কর্নেল রবের সাথে দেখা হয়ে যায়। এই দু’জনই তখন সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নিয়ে আওয়ামীলীগের টিকেটে একজন এম এন এ এবং একজন এমসিএ হয়েছেন। মতিনগর হয়ে ভারতের আগরতলায় যাচ্ছেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। খালেদের অনুরোধে তাঁরা ৪ এপ্রিল তেলিয়া পাড়ায় ফিরে আসেন বিদ্রোহী এই অফিসারদের সম্মেলনে যোগ দিতে।
৪ঠা এপ্রিল সকাল ১০টায় তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোয় কর্নেল ওসমানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া সেনা অফিসারদের প্রথম সম্মেল। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন
লেঃ কর্নেল আব্দুর রব (অবঃ) (পরব্রতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম চীফ অবস্টাফ)
লেঃ কর্নেল সালাউদ্দিন মোঃ রেযা(অভিনেত্রী স্মপারেজার বাবা)
মেজর কাজী নুরুজ্জামান (অবঃ) (সেক্ট্র ক্মান্ডার)
মেজর জিয়াউর রহমান( শহীদ রাস্ট্র প্তি)
মেজর কাজী মোহাম্মদ শফিউল্লাহ ( সেনা প্রধান)
মেজর খালেদ মোশাররফ (দেড় দিনের সেনা প্রধান )
মেজর নুরুল ইসলাম(প্রবাসী)
মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরি (ততবাব্ধায়ক স্রকারের উপদেস্টা)
মেজর শাফায়েত জামিল ( ৭৫ সালে ৪৬ ব্রিগেড ক্মান্ডার)
লেঃ আখতার আহমেদ (চিকিতস্ক)
এছাড়া বিএসএফের ব্রিগেডিয়ার পাণ্ডেও পর্যবেক্ষক হিসাবে এ সভায় যোগ দেন। সভায় বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক ও সুদুরপ্রসারী ফলাফলের পূর্বাপর বিশ্লেষণের পর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সঙ্কল্প ব্যক্ত করা হয়। এছাড়া এই যুদ্ধকে বৈধতা দেওয়া এবং বিদেশি সাহায্যের জন্যে সরকার গঠনেরও প্রয়োজন অনুভূত হয় তেলিয়াপাড়াতেই। এই সম্মেলনে গৃহিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাথমিক ভাবে চট্টগ্রাম-পারবত্য চট্টগ্রামের যুদ্ধের ভার দেয়া হয় মেজর জিয়া কে, সফিউল্লাহ পান ব্রাহ্মনবাড়িয়া-সিলেটের যুদ্ধের ভার আর খালেদ মোশাররফ কে দেওয়া হয় কুমিল্লা – নোয়াখলির দায়িতব। ৮ম বেঙ্গলের জনবল ছিল এমনিতেই কম। খারিয়া সেনানিবাসে বদলীর জন্যে তাদের অস্ত্র শস্ত্র যুদ্ধের আগেই তুলে দেয়া হয়ে ছিল জাহাজে। তার ওপর কালুর ঘাট সহ অন্যান্য যুদ্ধের ক্ষয় ক্ষতির কারনে ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ২য় বেঙ্গলের একটি কোম্পানীকে ৮ বেঙ্গলে দিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তও হয় এই সম্মেলনে।
এই সম্মেলনের ফলে পরিকল্পনাহীন বিদ্রোহ একটি যুদ্ধের রুপ নেয়। স্পস্ট হয়ে ওঠে সশস্ত্র মুক্তি যুদ্ধের রুপ রেখা।
ওসমানী পরদিনই আগরতলা যাত্রা করেন এই সম্মেলনে গৃহিত সিদ্ধান্ত দলীয় নেতৃবৃন্দকে জানাবার জন্যে। একইসময় বাংলাদেশর প্রথম প্রধান মন্ত্রী তাজ উদ্দিন একটি ছোট্ট ডাকোটা বিমানে আগরতলা পৌঁছান জনমত গঠন ও সাহায্যের আশায়। ১০ এপ্রিল গঠিত হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। শিলিগুড়ির একটি বেতার কেন্দ্র থেকে তাজ উদ্দিন সারা বিশ্বকে জানিয়ে দেন নতুন একটি দেশ, একটি জাতি এবং একটি যুদ্ধের কথা। সে দিন ১১ এপ্রিল ১৯৭১।
তথ্য সূত্র:
মঈদুল হোসেনঃ মূলধারা,Major General Shafiullah: Bangladesh at War, মেজর আখতার আহমেদ: বার বার ফিরে যাই, সাক্ষাৎকার: ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ; মুক্তিযুদ্ধের দলিল পত্র; ৯ম খন্ড, সাক্ষাৎকার: কর্নেল শাফায়েত জামিল; মুক্তিযুদ্ধের দলিল পত্র; ৯ম খন্ড
August Assemblage; Quamrul Hasan Bhuyan; dailystar
আমিই খালেদ মোশাররফ; সম্পাদনাঃ এম আর আখতার মুকুল

Share this post

scroll to top
error: Content is protected !!