ক্যাপ্টেন(অবঃ)মারুফ রাজুঃ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত পলাতক আসামিদের বাজেয়াপ্তকৃত সম্পত্তি বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ শহীদ পরিবারের মধ্যে বিতরণের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনালের দীর্ঘ ইতিহাসে এ ধরনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কোনো নজির নেই। একই সাথে সারা দেশ থেকে আসা জুলাই অভ্যুত্থানের ১০৯টি বাছাইকৃত মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া এক বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ আছে অথবা অর্থদণ্ডের আদেশ রয়েছে, সেগুলো কিভাবে দ্রুত বাস্তবায়ন করে শহীদ পরিবারের কল্যাণ ও সহায়তায় ব্যবহার করা যায়, সেই আইনি প্রক্রিয়া আমরা শুরু করেছি। এটি ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে প্রথম।’ তবে এই আদেশ বাস্তবায়নে বিদ্যমান ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ এ সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা না থাকায় কিছু আইনি জটিলতার কথা স্বীকার করে আমিনুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ আইন ও দেশের প্রচলিত অন্যান্য ফৌজদারি আইনের প্রয়োগযোগ্যতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে, যাতে দ্রুতই এর একটি দৃশ্যমান আইনি সমাধান আসে।
সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর জানান, জুলাই অভ্যুত্থানে সারা দেশ থেকে আসা ৫৯০টি অভিযোগের মধ্যে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ১০৯টি মামলা বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বিচারের গতি বাড়াতে কৌশলগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও নরসিংদীর মতো হটস্পটগুলোর একাধিক পৃথক ঘটনা আলাদা তদন্ত না করে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী একীভূত করা হচ্ছে। এতে সময় সাশ্রয় হবে এবং একটি সুসংগঠিত চার্জশিটের অধীনে বিস্তৃত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
ভারতে আশ্রয়ে থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ও সাজা কার্যকরের বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা দেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো আসামি অনুপস্থিত থাকলেও ট্রাইব্যুনাল আইনে বিচার চলতে বাধা নেই, তবে রায় কার্যকরের জন্য আসামির সশরীরে উপস্থিতি বা গ্রেফতার আবশ্যক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ -এর ২১(৩) ধারা উদ্ধৃত করে তিনি জানান, রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল দায়েরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেই নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় আইনিভাবে তার আর আপিল করার সুযোগ নেই। ফলে তিনি দেশে ফেরামাত্রই ঘোষিত সাজা কার্যকর হবে, কারণ প্রচলিত আইনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামির জামিনের সুযোগ নেই।
শেখ হাসিনার বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারসংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা পরিষ্কার করে মো: আমিনুল ইসলাম বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল কেবল বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ওপর। ট্রাইব্যুনাল তার স্বাভাবিক বা সাধারণ কথাবার্তা প্রচারে কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। ফলে বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তব্য বাদে সাধারণ বক্তব্য প্রচারে সংবাদমাধ্যমের কোনো আইনি বাধা নেই।
সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে চিফ প্রসিকিউটর পলাতক আসামিদের অবস্থানসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তা প্রসিকিউশনকে জানানোর জন্য সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আশ্বস্ত করেন, সঠিক তথ্য ও ভৌগোলিক অবস্থান পেলেই ইন্টারপোল ও আন্তর্জাতিক আইনি চুক্তির আওতায় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে।



