ক্যাপ্টেন(অবঃ)মারুফ রাজুঃ বিএনপি চেয়ারপার্সনের স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেছেন, খালেদা জিয়া সারাজীবন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। সৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে তার অবদান অনন্য। কঠিন সময়েও চরম ধৈর্যের পরিচয় দিতেন তিনি। দেশপ্রেমকে আজীবন লালন করেছেন।
বক্তারা আরও বলেন, খালেদা জিয়া বলতেন, ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, কিন্তু প্রভু নেই, দেশই আমার আসল ঠিকানা’। এ কারণেই তার শেষবিদায়ে মানুষের এতো ভালোবাসা পেয়েছেন, যা দেশের ইতিহাসের পাতায় ঐতিহাসিক হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন পরমতসহিষ্ণু। জাতির এই কঠিন সময়ে যখন তার উপস্থিতি, পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখনই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু তার আদর্শ চির অম্লান। এ দেশের মানুষ অনন্তকাল তাকে শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় স্মরণ করবেন। তার আদর্শই হবে আগামীর বাংলাদেশের চালিকাশক্তি। তার দর্শন মানতে হবে বিএনপি নেতাকর্মীদের।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মরণে শুক্রবার নাগরিক সমাজের উদ্যোগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত শোকসভায় দেশের বিশিষ্টজনেরা এসব কথা বলেন। বেলা আড়াইটার পর কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। শোকসভায় যোগ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। তবে তারা কেউ বক্তব্য রাখেননি। এসময় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেগম খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি দেওয়ার দাবি জানানো হয়। নাগরিক শোক সভায় ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র নতুন রাষ্ট্রদূত, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, পাকিস্তান, চীন, সৌদি আরব, আমিরাতে কাতারসহ ২৩ টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
খালেদা জিয়ার দুটো অর্জন কেউ ভাঙতে পারবে না বলে উল্লেখ করে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রথমত- বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত প্রথম প্রধানমন্ত্রী। দ্বিতীয়টি হচ্ছে- রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনি সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা পেয়েছেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে মূলত তিনটি পর্বে ভাগ করা যায় বলে উল্লেখ করে তিনি প্রথম পর্বটি ছিল তার উত্থানকাল, যা ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সময় তিনি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি বিপর্যস্ত রাজনৈতিক দলকে পুনর্গঠন করেন এবং নেতা হয়ে ওঠেন। দ্বিতীয় পর্বটি হচ্ছে- ১৯৯১ সাল থেকে তার সরকার পরিচালনা। দুই মেয়াদে সরকার পরিচালনা এবং এক মেয়াদে বিরোধী দলের নেতা তিনি। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। শেষ পর্বে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এবং সহানুভূতি হচ্ছে তার সেই ভিকটিম ইমেজ। মানুষ এই দুটোকে চিরদিন স্মরণ রাখবে।
লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, মানুষ বেগম জিয়াকে অনন্তকাল স্মরণ করবে। কারণ, দেশের জন্য তার ত্যাগ ও নিষ্ঠা অপরিসীম। তিনি এদেশের মানুষ, গাছ, লতাপাতা ও পানি ভালো ভাসতেন। বলতেন, ‘দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই। বিদেশে আমার কোনও ঠিকানা নেই’। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলেও তার আদর্শ চির অম্লান হোক। তিনি আরও বলেন, তার দেওয়া মন্ত্রগুলো ধারণ করলে তার দল এবং দেশ রক্ষা পাবে, অন্যথায় পাবে না। তার মৃত্যুতে সময় এবং আগামীর মৃত্যু হয়নি, বরং খালেদা জিয়া এবং তার আদর্শই হবে আগামীর বাংলাদেশের চালিকাশক্তি।
খালেদা জিয়ার প্রতি স্মৃতিচারণা করে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশে মানুষ আজ স্বাধীনভাবে ঘৃণা ও ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারছে। এ জন্য এক নেত্রীর স্থান হয়েছে মানুষের হৃদয়ে, আরেকজনের স্থান হয়েছে বিতাড়িত ভূমিতে।’
আসিফ নজরুল বলেন, বেগম খালেদা জিয়া যখন জীবিত ছিলেন, আমি তার জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রামে যেতাম। তখন একটা কথা বলতাম, বেগম জিয়া ভালো থাকলে, ভালো থাকবে বাংলাদেশ। আমি বিশ্বাস করি, অবশ্যই উনি এখন ভালো আছেন। কিন্তু বাংলাদেশ কি ভালো আছে?
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন বলেন, বাংলাদেশ রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম বেগম খালেদা জিয়া। তিনি সাধারণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ছিলেন রাজনৈতিক আদর্শ। ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অসাধারণ দৃঢ়চেতা। এসময় সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেগম খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি দেওয়ার দাবি জানান।
‘বাংলাদেশ ছাড়া আমার কোনো ঘর নেই’- খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্য উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘এই কথাটা সবাইকে মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের ভবিষ্যৎ এই দেশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দেশের স্থিতিশীলতা, মানুষের আস্থা যতটা বাড়বে, আমাদের সবার সুযোগ ততটা বাড়বে। ব্যবসায়ী সমাজও এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে নিয়মকানুন শক্ত হবে। বিশ্বাস তৈরি হবে। তরুণ প্রজন্ম সামনে এগিয়ে যাওয়ার আরও বেশি সুযোগ পাবে। বিদেশে জাতীয় সম্পদ পাচারের প্রবণতা বহুলাংশে হ্রাস পাবে।’
তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সরকারের সময় অবকাঠামো উন্নয়ন, আইনের শাসন, বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার নীতি দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সাহায্য করেছে।’
ডেইলি ষ্টার সম্পাদক মাহফুল আনাম বলেছেন, আমার সৌভাগ্য যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। একজন স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে তিনি আমার মন জয় করে নিয়েছেন। দেশকে ভালোবেসে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। ৭ আগস্ট মুক্ত হয়ে ভাষণ বলেছিলেন ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি। খালেদা জিয়ার শেষ বাণী জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আহবান- আমরা সবাই যেন এটাকে ধারণ করি।
ডেইলি নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির বলেন, মানুষ ও রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ছিল রুচিশীলতা ও পরিমিতিবোধ। বিশেষ করে যখন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শালীনতা ও সংযমের ঘাটতি প্রকট, তখন নিজের ওপর ও তার পরিবারের ওপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আঘাত ও দুর্ভোগ নেমে এসেছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় তিনি কখনোই প্রকাশ্যে নিজের বেদনা, ক্ষোভ কিংবা নিন্দাসূচক কোনো বক্তব্য উচ্চারণ করেননি। এই বিষয়টি আজকের বাংলাদেশের অসহিষ্ণুতার সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।
আইসিসি বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে ব্যবসা এবং অর্থনীতির উন্নতির জন্য খালেদা জিয়ার অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী। নব্বইয়ের দশকে খালেদা জিয়ার বাজারমুখী নীতির ফলে বেসরকারি খাত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি আসে। খালেদা জিয়ার সময় ভ্যাট পলিসি, আর্থিক খাতের সংস্কার, প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনীতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী হয়। প্রবাসী আয়, রপ্তানি বৃদ্ধি উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করা হয়।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ‘উইলফুল নেগলিজেন্স’ (ইচ্ছাকৃত অবহেলা) হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে খালেদা জিয়ার লিভারের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এটা উনাকে হত্যা করার সুদুর প্রসারী পরিকল্পনার অংশ কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। খালেদা জিয়া ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড–১৯ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তারা, বর্তমান মেডিক্যাল বোর্ড, তার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেনও বলে জানান তিনি।
খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জন’ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন অনেকে করেন উল্লেখ করে এই চিকিৎসক বলেন, ‘আমার উত্তর হলো, মেথোট্রেক্সেট সেই ওষুধ, যেটা তার ফ্যাটি লিভার অসুখ বাড়িয়েছিল এবং সেটা লিভার সিরোসিসে নিয়ে গিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে এটা তার লিভারের জন্য স্লো পয়জন ছিল।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জাতির এই সন্ধিক্ষণে যখন তার (খালেদা জিয়া) উপস্থিতি, পরামর্শ, দিক নির্দেশনা সম্ভবত সবচেয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল তখনই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। উনি হয়তো চাইতেন আজকের এই চ্যালেঞ্জগুলো আমরা সকলে একত্রিতভাবে, নীতিনিষ্ঠভাবে দেশ ও মাতৃকার প্রতি ভালোবাসা থেকে যৌথভাবে মোকাবিলা করি।
খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকবার্তা পাঠ করেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন। সভায় একে একে বক্তব্য দেন লেখক ফাহাম আবদুস সালাম, পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী দেবাশীষ রায়, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, সিনিয়র সম্পাদক শফিক রেহমান, ডিপিআইয়ের সভাপতি আবদুস সাত্তার দুলাল, সাবেক কূটনৈতিক আনোয়ার হাশিম, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ, লেখক ও গবেষক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর; শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন। এরপর খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে স্মরণসভা শেষ হয়। সাবেক এই সরকারপ্রধানের স্মরণে আয়োজিত সভায় যোগ দেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ, মনির হায়দার প্রমুখ।
শোকসভায় যোগ দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ সিনিয়র নেতারা। এতে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সম্পাদক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেন।


