DMCA.com Protection Status
ADS

একজন জিয়াউর রহমান এবং তাঁর বাংলাদেশ

10371891_591735440934746_3172800240156040867_nপ্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের পর ১৯৮১ সালের ৬ জুন হংকং থেকে প্রকাশিত 'ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ' মন্তব্য করেছিল, 'ঠিক যেন জুলিয়াস সিজারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি।' ঘনিষ্ঠজনদের নিষেধ সত্ত্বেও তিনি চট্টগ্রাম চলে গেলেন তার করুণ ভাগ্যকে বরণ করার জন্য। তাকে জানানো হয়েছিল চট্টগ্রাম সেনানিবাসের কমান্ডার জেনারেল মঞ্জুর তার ওপর রুষ্ট। সেখানে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ়চেতা জিয়া সে কথা শোনেননি। তিনি সাবধানকারীদের বলেছেন, 'ও আমাকে চট্টগ্রামে হত্যা করবে কেন? তাতে তো সে ক্ষমতা পাবে না।' তিনি চলে গেলেন হিমশীতল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য। নিয়তির কী পরিহাস, তার বক্তব্যই সত্য হলো। জেনারেল মঞ্জুর ক্ষমতা পাননি।তাকেও চলে যেতে হয়েছে না ফেরার দেশে।

 

জুলিয়াস সিজার ছিলেন একজন অসীম সাহসী বীর। রোমের এ মহান দেশপ্রেমিক বীরের নাম অনেকেই জানেন। তার ভাগ্যেও জুটেছিল করুণ পরিণতি। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্রুটাসসহ অন্যান্য চক্রান্তকারী সিনেট সভায় সংবর্ধনার কথা বলে তাকে নিয়ে যায় এবং নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। আগের রাতে তার স্ত্রী ক্যালিফোর্নিয়া একটা দুঃস্বপ্ন দেখে সিজারকে সিনেট সভায় যেতে বারণ করে বলেছিলেন, 'তুমি যেও 10300628_591733577601599_1347558852449104172_nনা সিনেট সভায়।' কিন্তু মহাবীর সিজার তা শোনেননি। তিনিও বলেছিলেন, 'আমাকে হত্যা করে ওদের কি লাভ?' যথার্থ ছিল তার কথা। ব্রুটাসরা রোমের ক্ষমতা দখল করতে পারেনি।

 

দুই.

 

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। আমাদের জাতীয় অহঙ্কার-অধ্যায়কে তিনি আলোকিত ও সমৃদ্ধ করেছেন। জাতিগতভাবে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতার ইতিহাসে বর্ণালি হরফে লেখা আছে তার নাম। অল্প জীবনে বিশাল তার অর্জন। তার অর্জন জাতিকে সিক্ত করেছে নতুন প্রাণ-বন্যায়।

 

10364134_591736877601269_5616100816514205643_nজীবনের সর্বক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন সফল মানুষ। স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবেন; কিন্তু বেছে নিলেন সৈনিকের জীবন। যোগ্যতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার গুণে ও মানে তিনি সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। যোদ্ধা হিসেবেও সাফল্যের জয়মালা পরেছেন তিনি। পাক-ভারত যুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের খেমকারান সেক্টরে তার 'আলফা কোম্পানি' দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাফল্য পদক পেয়েছিল। পাকিস্তান সামরিক একাডেমির প্রশিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়। একজন সৈনিক এবং সাহসী যোদ্ধা হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। শৃঙ্খলিত একটি দেশের একজন দেশপ্রেমিক সৈনিকের সেরা স্বপ্ন থাকে নিজের স্বদেশ ভূমিকে শৃঙ্খলমুক্ত করার। জিয়াউর রহমান অপার সৌভাগ্যের অধিকারী সেই সৈনিক পুরুষ, যিনি দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে কান্ডারির ভূমিকা পালন করেছেন। জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতা যুদ্ধে জাতিকে দিয়েছেন সঠিক পথের নিশানা। জাতির শৃঙ্খল মুক্তির দুর্বার, দুর্দমনীয় অভিযানে তিনি ছিলেন এক বিশ্বস্ত ও সাহসী সিপাহসালার।

 

সচেতন ও জাগ্রত মানুষ হিসেবে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা আমাদের সবার মনে আছে। এও মনে থাকার কথা যে, তখন পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের সমগ্র জনগণের দ্বন্দ্ব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা ছিল মীমাংসার অযোগ্য। যুদ্ধ ছাড়া সে দ্বন্দ্ব ফয়সালার অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। ভোট তো হয়েছিল '৭০ সালে। ইয়াহিয়ার লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের আওতায় পাকিস্তান সংবিধানের অধীনে সেই সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নিরঙ্কুশ রায় দিয়েছেন আওয়ামী লীগের পক্ষে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পরও আওয়ামী লীগের কাছে পশ্চিম পাকিস্তানি কুচক্রীরা ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। এ দেশের সব মানুষ বুঝে গিয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তানিদের কাছে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক চক্র কিছুতেই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ক্ষমতা অর্পণ করবে না। সবাই বুঝল, বুঝল না শুধু আওয়ামী লীগ এবং তাদের কিছু অন্ধ স্তাবক-পরামর্শক। মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর আপস নাটক চলল কিছুদিন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য 10363422_591735497601407_6635617836352117095_nপ্রস্তুত শেখ মুজিবুর রহমান। ১৮ মার্চ তিনি সাংবাদিকদের জানালেন যে, তাদের আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে। ১৯ মার্চ শেখ মুজিব একজন সিনিয়র সামরিক অফিসারকে জানালেন যে, তিনি এবং ইয়াহিয়া ১১ জন মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠনের ব্যাপারে একমত হয়েছেন। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীসহ ছয়জন আসবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে এবং পাঁচজন আসবেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে-পিপিপি থেকে তিনজন ও ওয়ালী খানের ন্যাপ থেকে দুজন। মাসুদুল হকের লেখা 'বাঙালি হত্যাকান্ড- ও পাকিস্তানে ভাঙন' গ্রন্থে এ তথ্য সন্নিবেশিত আছে।

 

আসলে এসবই ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের সহযোগীদের কূটকৌশল। ক্ষমতার টোপ ফেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে রেখে তারা আসলে শান দিচ্ছিল অস্ত্রে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্যসামন্ত এনে পূর্ব পাকিস্তানে তারা শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। জাতি এর কিছুই জানল না। কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না তাদের সামনে। ২৫ মার্চ কালরাতে অকস্মাৎ গর্জে উঠল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতিয়ার। নিরস্ত্র, নিরপরাধ, ঘুমন্ত জাতির ওপর হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। বেঘোরে প্রাণ হারাল অগণিত মানুষ।

 

10418539_591734077601549_1228060062377459771_nরাজনৈতিক নেতৃত্বহীন, অপ্রস্তুত, অসংগঠিত জাতি যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, ঠিক সে মুহূর্তে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে এলো একটি বজ্রকণ্ঠ- আমি মেজর জিয়া বলছি…। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন ব্যর্থ, সৈনিক জিয়া তখন হাল ধরলেন। আশাহত, শঙ্কিত জাতিকে আশাজাগানিয়া গান শোনালেন তিনি। ঘোষণা করলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান ২৬ মার্চের স্মৃতি উল্লেখ করে তার আবেগাপ্লুত অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন এভাবে- 'কালুরঘাট ট্রান্সমিশন স্টেশন থেকে জিয়ার কণ্ঠে আমরা স্বাধীনতার ঘোষণাবাণী শুনতে পেয়েছিলাম। সে মুহূর্তটি আমাদের জীবনের আশা ও উদ্দীপনার একটি তীব্রতম মুহূর্ত ছিল। যখন চতুর্দিকে বিশৃঙ্খলা এবং সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের অভাব, ঠিক সেই মুহূর্তে জিয়ার কণ্ঠস্বরে স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার দাবি একটি বিস্ময়কর মানসিকতার সৃষ্টি করেছিল। আমরা তখনই ভাবতে পেরেছিলাম যে, কোনো কিছুই হারিয়ে যায়নি, আবার সবকিছু ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।' (স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, ১৫ খ-, পৃ. ৪৪৩)। এভাবেই বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যান জিয়াউর রহমান।

 

স্বাধীনতা ঘোষণায় জিয়াউর রহমানের ভূমিকার বৈশিষ্ট্য হলো, এ মহান কাজটি তার করার কথা ছিল না। বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ দায়িত্বটি পালন করে থাকেন। স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতা মৃত্যুবরণ করতে পারেন, যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করতে পারেন না; কিন্তু জাতি সেদিন যাকে নেতৃত্বের আসনে বরণ করেছিল, দুর্যোগ শুরুর রাতে তিনি বন্দি হয়ে যান শত্রু সেনাদের হাতে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুপস্থিতি, কারও কারও ভীরুতা ও ব্যর্থতা ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন জিয়া। একজন সৈনিকের স্বাধীনতা ঘোষণার এ এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। জিয়ার ঘোষণা ছিল দুটি। প্রথমটি নিজের, পরেরটি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে। দ্বিতীয় ঘোষণাও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দিয়েছিলেন 'মেজর জিয়া, অন্য কেউ নয়। এবারই আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানের প্রথম ঘোষণাটির কথা স্বীকার করেছে-যদিও বলেছে তা নাকি অপাঙ্ক্তেয়।' স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের তৃতীয় খন্ডে কিন্তু প্রথম ঘোষণাটির কথা উল্লেখ আছে। তাতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার কারণে তার প্রথম ঘোষণাটি নষ্ট করে ফেলা হয়।

 

শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধ নয়, জাতির আরেক ক্রান্তিলগ্নে তিনি কান্ডারির ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাকশালী একদলীয় শাসন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুঃখজনক পতন ঘটে। এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হন সপরিবারে। ক্ষমতায় বসেন তারই রাজনৈতিক সহকর্মী ও বাকশালের ২য় সর্বোচ্চ নেতা খোন্দকার মোশতাক আহমদ। শেখ মুজিবের মন্ত্রীরাই মোশতাক মন্ত্রিসভাকেও আলোকিত করেন।জাতীয় সংসদ বহাল থাকে,সংবিধান ছিল সমুন্নত। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক পাল্টা অভ্যুত্থানে মোশতাক সরকারের পতন ঘটে। খালেদ মোশাররফ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল জিয়াকে বন্দি করেন। সারা দেশে তখন টানটান উত্তেজনা। রেডিও, টিভি বন্ধ। কোথায় কী হচ্ছে কেউ জানে না। তবে সিপাহি-জনতার মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে যে, মোশতাক সরকারের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ক্ষুব্ধ ভারত এ কাজটি করিয়ে থাকতে পারে। এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়, যখন খালেদ মোশাররফের মা, তার ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ ও মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের সমর্থনে একটি মিছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে শেখ মুজিবের বাসভবনে গিয়ে শোকের মাতম তোলে। মুহূর্তে পাল্টে যায় পরিস্থিতি। সিপাহি-জনতা ঘুরে দাঁড়ায়। ৭ নভেম্বরের সকালে সূর্য উঠে নতুন বার্তা নিয়ে। বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল বাংলাদেশের ইতিহাসে। সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটল খালেদের। বন্দিদশা থেকে সৈনিকরা মুক্ত করল তাদের প্রিয় সেনাপ্রধান জিয়াকে। তার ওপর অর্পণ করল রাষ্ট্রীয় সর্বক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ভার। যে মানুষটি দেশ ও জাতির দুটি কঠিন রাজনৈতিক সঙ্কটে, ক্রান্তিকালে অনেকটা ত্রাতার ভূমিকা পালন করেছেন, রাজনীতি তার নিয়তির লিখন হবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। বস্তুত ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমেই জাতীয় রাজনীতিতে তার উত্থানের সূচনা অথবা অভিষেক। স্বল্প পরিসরের রাজনৈতিক জীবনে সততা ও কর্মনিষ্ঠার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি। দিনে ১৮ ঘণ্টা অবিশ্রান্ত কাজের মধ্য দিয়ে তিনি অর্জন করেছিলেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়কের গৌরব। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার ও স্বচ্ছ, চিন্তাধারা ছিল অগ্রসর-শুধু আগামী দিনের নয়, আগামী যুগের। তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতেন এবং দ্রুত তা বাস্তবায়ন করতেন।

 

বিশাল এক শূন্যতার মাঝে জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতির হাল ধরেন। স্বপ্নহীন একটি জাতির চোখের তারায় তারায় তিনি ছড়িয়ে দেন উন্নতি ও সমৃদ্ধির স্বপ্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির নিরলস প্রচেষ্টা ও কঠোর শ্রম সে জাতিকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। এ উদ্দেশ্যে সর্বাগ্রে তিনি আমাদের জাতিসত্তার সঠিক ঠিকানা নির্ণয় করেন।

 

তিনিই প্রথম উচ্চারণ করেন, আমরা বাংলাদেশী। বাঙালি নয়; বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদই হবে আমাদের দর্শন। ধর্মের দিক থেকে আমরা কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু, কেউ বা বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান। কিন্তু ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভূগোল, অর্থনীতি, ভাষার সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বাধীনতার যুদ্ধ আমাদের একটি বিশিষ্ট জাতীয়তার স্বীকৃতি দিয়েছে। সীমান্তের বাইরে যারা বাংলা ভাষার জন্য সংগ্রাম করেনি, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও আত্মাহুতি দেয়নি তাদের কেমন করে আমাদের আত্মত্যাগের অংশীদার করব? কেমন করে এবং কেন আমাদের পতাকা ও মানচিত্রের হকদার করব? এটাই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মূল কথা। তার ভাষায় ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভূগোল, অর্থনীতি, ভাষায় সংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধ- এ সবকিছুকে নিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের সমগ্র জাতীয়তাবাদ-আর এ সমগ্র জাতীয়তাবাদই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। তার এই দর্শন দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মধ্যে সৃষ্টি করে এক অবিনাশী ঐক্যচেতনা। তার নেতৃত্বে একটি ঘুমন্ত জাতি যেন জেগে ওঠে। সৃষ্টি হয় এক জাতীয় জাগরণ।

 

জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জারি করা বাকশাল ব্যবস্থার সাংবিধানিক ফরমান বাতিল করে সভ্য ও গণতান্ত্রিক শাসনধারার সূচনা করেন তিনি। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। বিচার বিভাগকে প্রতিষ্ঠিত করেন স্বমর্যাদায়। উৎপাদন ও উন্নয়নের চাকা সচল হয় তার হাতের জাদুকরী স্পর্শে। অর্থনীতির শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা ফিরে আসে। বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি-এ অপবাদ ঘুচিয়ে দেন জিয়া।

 

10303752_591737184267905_6822919934076433972_nস্বনির্ভর, সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ ছিল তার স্বপ্ন। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য চারটি শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন তিনি। এগুলো ছিল-

 

১. কৃষি বিপ্লব ২. গণশিক্ষা বিপ্লব ৩. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিপ্লব ও ৪. শিল্প বিপ্লব।

 

কৃষি বিপ্লবের কর্মসূচির আওতায় তার আমলে দেড় বছরে ১ হাজার ২০০ খাল কাটা হয়েছিল। খাদ্য উৎপাদন বেড়েছিল রেকর্ড পরিমাণ। গণশিক্ষা বিপ্লব কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১ কোটি বই ছাপা হয়েছিল। দেড় বছরে ৪০ লাখ বয়স্ক মানুষ সাক্ষর হয়েছিল। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাণীতে উদ্বুদ্ধ হয় লাখ লাখ নর-নারী। কলে-কারখানায় উৎপাদন চলে অবিশ্রান্ত গতিতে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছিল। তার শাসনামলে দেশের আইন-কানুন পরিস্থিতিও ছিল যথেষ্ট উন্নত।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ও অবদান ছিল দিগন্তপ্রসারী। তার শাসনামলের শুরুতে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় এক ভয়াবহ সংঘর্ষের আশঙ্কার সূত্রপাত হয়েছিল। বহিঃআক্রমণ, সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি, বন্ধুত্বসূচক চুক্তি লঙ্ঘনের উসকানি, সীমান্তের অপর পাড়ে বিদ্রোহীদের তৎপরতা একযোগে এক অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। তিনি দৃঢ়চিত্তে সেই ভয়াবহ অবস্থা মোকাবিলা করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার জন্য বিদেশি সমর্থন ও ভারতের সহযোগিতা লাভে সক্রিয় ও সফল কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। বিদেশনীতির ক্ষেত্রে তিনি তার দৃষ্টি উঁচু রাখতেন এবং কোনো ধরনের সন্দেহ ও হীনমন্যতার মনোভাব পোষণ করতেন না। পরমুখাপেক্ষিতা বর্জন করে গভীর আস্থায় তিনি মুক্ত বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করেন। বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নে জিয়াউর রহমানের সার্ক-চিন্তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি করে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনি ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তুরস্কে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলনে যোগদান ছিল ১৯৭৫-এর পর তার প্রথম বিদেশ সফর। ১৯৭৬ সালের মার্চে সৌদি বাদশাহর সঙ্গে তার বৈঠক ছিল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী দেশগুলোর ঐক্যের ক্ষেত্রেও তিনি পালন করেন যুগান্তকারী ভূমিকা। ইরান-ইরাক ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বন্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ইতিহাসের অন্তর্গত বিষয়। তৃতীয় বিশ্বের সংহতির ক্ষেত্রে কৌশলগত বিষয়াদি নির্ধারণ ও মধ্যস্থতায় তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তার পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য হিসেবেই তার আমালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ করেছিল।

 

10372056_591740647600892_4189541962180637299_nসৈনিক, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক-সর্বক্ষেত্রেই জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সফল মানুষ। একটি যোদ্ধা, স্বাধীনচেতা, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও অগ্রসর বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির জাতি হিসেবে তিনি সারা দুনিয়ায় আমাদের মাথা উঁচু করেছিলেন। জিয়া যখন রাজনীতি শুরু করেন, তখন অগণিত মানুষের সমর্থন তার পক্ষে ছিল না। কঠোর পরিশ্রম, সততা ও কাজ দিয়ে তিনি জনচিত্ত জয় করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত নতুন দল বিএনপিকে দেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করে দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সফল হয়েছেন। আর এখন বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়েও ৩৫ বছরের পুরনো দলটি বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। বলা হয়ে থাকে, দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়ন দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদীদের ভরসার স্থল জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে প্রায় গিলে ফেলেছে। নীতিবান, আদর্শবাদীরা বিতাড়িত প্রায়। সরকারের অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক আচরণের দোহাই দিয়ে লাভ নেই। তাতে ব্যর্থতা ঢাকা যাবে না। বিএনপি যখনই বিরোধী দলে ছিল কোন সরকার দলটির সঙ্গে গণতান্ত্রিক, শোভন আচরণ করেছে? তখন পারলে এখন পারবে না কেন বিএনপি? আসলে জাতির বর্তমান ক্রান্তিকালে বিএনপিতে প্রয়োজন শহীদ জিয়ার মতো দুর্নীতি-দুরাচারমুক্ত, নিরহঙ্কার একজন 'রাখাল রাজার'।

 

Share this post

scroll to top
error: Content is protected !!