ক্যাপ্টেন(অবঃ)মারুফ রাজুঃ বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির সুরক্ষার কথা বলা হলেও আইনজ্ঞদের স্পষ্ট মত- এটি কোনো ‘অ্যাবসলিউট ইমিউনিটি’ বা চিরস্থায়ী ছাড় নয়। পদ ছেড়ে দেয়ার পর বা মেয়াদ শেষে রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন অপরাধের জন্যও তাকে সাধারণ নাগরিকের মতো বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তিন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে আইনের শাসন সর্বজনীন এবং রাষ্ট্রপতির অনাক্রম্যতা কেবল তার মেয়াদকালের প্রশাসনিক ও পদমর্যাদাগত সুরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ।
- রাষ্ট্রপতির সুরক্ষা পদকেন্দ্রিক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। পদ ছাড়লেই সাময়িক সুরক্ষার আবরণ উঠে যায়। (অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম)
- দাফতরিক সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা না গেলেও ফৌজদারি অপরাধে কোনো দায়মুক্তি সংবিধানে নেই। (অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম)
- রাষ্ট্রপতি থেকে বিদায় নেয়ার পর ফৌজদারি অপরাধের দায়মুক্তি দাবি করা যাবে না; তাহলে দেশে আইনের শাসনই থাকবে না। (অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির)
সংবিধানের সুবিধা ব্যবহার করে রাষ্ট্রপতির যেকোনো অপরাধের থেকে অনাক্রম্যতা বা ঢালাও দায়মুক্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকাকালীন নির্দিষ্ট কিছু আইনি সুরক্ষা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ভিন্নতা থাকলেও সংবিধান ও দেশের প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।
সংবিধানের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির সুরক্ষার কথা বলা হলেও আইনজ্ঞদের স্পষ্ট মত- এটি কোনো ‘অ্যাবসলিউট ইমিউনিটি’ বা চিরস্থায়ী ছাড় নয়। পদ ছেড়ে দেয়ার পর বা মেয়াদ শেষে রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন অপরাধের জন্যও তাকে সাধারণ নাগরিকের মতো বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তিন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে আইনের শাসন সর্বজনীন এবং রাষ্ট্রপতির অনাক্রম্যতা কেবল তার মেয়াদকালের প্রশাসনিক ও পদমর্যাদাগত সুরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ আহসানুল করিম বলেন, সংবিধানের এই সুরক্ষা মূলত রাষ্ট্রপতি যতদিন পদে বহাল থাকেন, ততদিনের জন্য প্রযোজ্য। ‘পদমর্যাদাগত কারণে রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় কারো বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা করা যাবে না বা ওয়ারেন্ট জারি করা যাবে না এটি কেবল ওই সময়কালের জন্য। কিন্তু পদত্যাগের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি তখন সাধারণ নাগরিক। ফলে রাষ্ট্রপতি থাকার সময় বা তার আগে যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তবে পদ ছাড়ার পর ওই অপরাধের জন্য মামলা করতে সংবিধানে কোনো বাধা নেই।’
তিনি আরো স্পষ্ট করেন যে, রাষ্ট্রপতির সুরক্ষার বিষয়টি সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদের প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত এবং এটি দায়িত্ব পালনের ভেতরের কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দায়িত্বের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে দুর্নীতি বা ফৌজদারি অপরাধ করলে তার সুরক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ‘জনতা টাওয়ার’ দুর্নীতি মামলা ও অস্ত্র মামলার নজির টেনে তিনি বলেন, ‘ড্রাইভারকে যদি আপনার মেয়েকে স্কুলে আনার কাজ দেয়া হয়, তবে সেটুকু তার দায়িত্ব। কিন্তু সে যদি গাড়ি নিয়ে অন্য কোথাও চলে যায় ও দুর্ঘটনা ঘটায়, তাকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেমন ফ্রান্সের নিকোলা সারকোজি বা পেরুর আলবার্তো ফুজিমোরির বিচার হয়েছে, বাংলাদেশেও এরশাদের বিচার তার প্রমাণ।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় জানান, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের মূল বক্তব্য অনেকে ভুল ব্যাখ্যা করছেন। অফিসিয়াল ক্যাপাসিটিতে (দাফতরিক ক্ষমতায়) নেয়া সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা না গেলেও ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কোনো দায়মুক্তি নেই। ‘আর্টিকেল ৫১-এর বক্তব্য হচ্ছে, অফিসিয়াল ক্যাপাসিটিতে রাষ্ট্রপতি যে সমস্ত কাজ করবেন; যেমন কাউকে অ্যাটর্নি জেনারেল বা মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া; সেগুলো নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। কিন্তু তিনি যদি কোনো ফৌজদারি অপরাধে সম্পৃক্ত থাকেন, সেটির কোনো দায়মুক্তি সংবিধানে নেই। যখনই তার মেয়াদ শেষ হবে বা তিনি পদত্যাগ করবেন, তখনই ফৌজদারি কার্যধারা গ্রহণ করা যাবে।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট টেনে এই আইনজ্ঞ বলেন, জুলাইয়ের ঘটনার সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার কোনো দাফতরিক নির্দেশনা বা গণহত্যা দমনের মতো বিষয়ে কোনো বেআইনি পরামর্শ বা সম্পৃক্ততা যদি প্রমাণ করা যায়, তবে তা অফিসিয়াল কাজের মধ্যে পড়ে না। সেক্ষেত্রে সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধেও ফৌজদারি বিচার হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির স্পষ্ট জানান, পদত্যাগের পর সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে যেকোনো অপরাধের বিচার হওয়া একটি ‘সেটেলড ল’ (সুসংপ্রতিষ্ঠিত আইন)। ‘৫১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কার্যভারকালে মামলা বা ওয়ারেন্ট জারি করা যায় না। কিন্তু তিনি যখন কার্যভারে থাকবেন না, তখন কি হবে? কার্যভারে না থাকলে ফৌজদারি মামলা ও তদন্তে কোনো বাধা নেই। আপনি রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় ৫০০ কোটি টাকা মেরে দেবেন, আর বিদায় নেয়ার পর দায়মুক্তি চাইবেন তাহলে দেশে আইনের শাসন থাকার দরকার কী?’
তিনি এরশাদসংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের উচ্চ আদালতের দু’টি ঐতিহাসিক রায়-৪৩ ডিএলআর (আপিল বিভাগ) পৃষ্ঠা ৫০ এবং ৩৭ বিএলডি (হাইকোর্ট বিভাগ) পৃষ্ঠা ৬৬৮ উদ্ধৃত করে বলেন, ‘ওই মামলাগুলোতে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন- রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় অপরাধ ঘটলেও মেয়াদ শেষে মামলা ও বিচার চলতে আইনত কোনো বাধা নেই। পৃথিবীর কোথাও এ ধরনের ঢালাও ছাড় নেই।’
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির সুরক্ষার দুটি প্রধান দিক রয়েছে। ৫১ (১) অনুচ্ছেদ : রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনকালে নেয়া সিদ্ধান্ত বা কোনো কাজ করা বা না করার জন্য তাকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। ৫১ (২) অনুচ্ছেদ : রাষ্ট্রপতির কার্যকাল চলাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যাবে না এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা যাবে না।
আইনবিদদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই দু’টি ধারার কোনোটিই রাষ্ট্রপতিকে ব্যক্তিস্বার্থের অপরাধ, দুর্নীতি বা ফৌজদারি অপকর্ম থেকে চিরস্থায়ী সুরক্ষা বা ‘অ্যাবসলিউট ইনডেমনিটি’ দেয় না। পদত্যাগের পরপরই রাষ্ট্রপতির সাময়িক আইনি আবরণ খসে পড়ে।
সম্প্রতি সাবেক রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও বিচার বিভাগে আলোচনা তৈরি হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্য সামনে আসে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেছেন যে, দায়িত্বে থাকাকালীন নেয়া সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুরক্ষার সুযোগ থাকলেও রাষ্ট্রপতি হওয়ার পূর্ববর্তী বা পদত্যাগের পরবর্তী অপরাধের বিষয়টি আইন অনুযায়ী বিবেচ্য। আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান সরকার যেকোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন।
আইনবিদদের মতে, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা যেকোনো অভিযোগ যদি তার ব্যক্তিগত অপরাধ বা সাংবিধানিক ক্ষমতার বাইরে গিয়ে করা কোনো কাজের সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে সংবিধান অনুযায়ী তদন্ত, গ্রেফতার ও বিচারে কোনো আইনি বাধা অবশিষ্ট নেই।




