DMCA.com Protection Status
ADS

প্রভাবশালীদের খপ্পরে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার মামলা

images0V3PBJZZদৈনিক প্রথম বাংলাদেশ অনুসন্ধানঃ  প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্য ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর গাফিলতি আর আইনের ফাঁকফোকরে ঝুলে আছে অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) ব্যবসার মামলা। গত এক দশকে সাড়ে ছয় হাজার মামলা হলেও কারও সাজা হয়নি এই অবৈধ কর্মকান্ডের কারণে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন আদালতে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার অবৈধ ভিওআইপির মামলা রয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে করা মামলার সংখ্যা দেড় হাজারের মতো। কিন্তু বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য নেই। তাদের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে অবৈধ ভিওআইপির প্রায় ২০০ মামলা বিচারাধীন।

২০০১ সালের বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইনের আওতায় এসব মামলা করা হয়। কিন্তু ১০ বছরে একটি মামলারও বিচার শেষ হয়নি। আইনগত দুর্বলতা ও অসংগতির কারণে থেমে আছে মামলার কার্যক্রম।

অন্যদিকে ভিওআইপিবিরোধী অভিযানে আটক বা জব্দ করা মালামাল বা যন্ত্রপাতি কোথায় যাচ্ছে, সে হিসাব দিতে পারেনি বিটিআরসি বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জানতে চাইলে র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, ভিওআইপি সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা গ্রেপ্তারও হন। কিন্তু কারও সাজা হওয়ার খবর জানা নেই।

রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ভিওআইপির চোরা-বাণিজ্য শুরু হয় ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ওই সময় স্পেক্ট্রা সলিউশন, ঢাকার চিঠি, হাইটেকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট লোকজনের মাধ্যমে। পরে বিএনপি সরকারের আমলে এ ব্যবসা আরও বেড়ে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কিছু লোক দেখানো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও একেবারে বন্ধ করা যায়নি অবৈধ ভিওআইপি। এক-এগারোর পর আওয়ামী লীগের আমলে এটা আরও বাড়তে থাকে। অবৈধ এ বাণিজ্যে কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও তাঁদের আত্মীয়স্বজন জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে। ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন সাংসদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার নামও আলোচনায় আসে। কিন্তু তাঁরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। কখনোই আইনের আওতায় আনা যায়নি তাঁদের।

গত বছরের আগস্টে ভিওআইপি দুর্নীতিতে প্রায় ৬০৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিটিসিএলের সাবেক দুই এমডিসহ মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জড়িত থাকার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যায়।

থেমে আছে মামলা: বিচারাধীন বেশ কিছু মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাত বছরের বেশি সময় ধরে চলছে বেশ কয়েকটি মামলার তদন্তকাজ। আবার আদালতে অভিযোগপত্র জমা হওয়ার পরও আইনি জটিলতায় বন্ধ রয়েছে অনেক মামলার কার্যক্রম। ভিওআইপি মামলা পরিচালনার জন্য কর্তৃপক্ষের নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার বিধান থাকলেও অধিকাংশ মামলায় আইনজীবী নিয়োগ দেয়নি বিটিআরসি। পাশাপাশি শতাধিক মামলায় এক হাজারের বেশি সাক্ষীর কাউকেই হাজির করতে পারেনি পুলিশ।

২০০৮ সালের নভেম্বরে ব্রডব্যান্ড সলিউশনের স্বত্বাধিকারী এস এম আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় অবৈধ ভিওআইপির মামলা করা হয়। এর দুই মাস আগে একই থানায় সফটটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউদ্দিন ফারুকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। দুটি মামলারই তদন্ত করছেন বিটিআরসির প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ। ছয় বছরেও তিনি আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেননি। রাজধানীতে এ ধরনের মামলার সংখ্যা ২০টির বেশি।

রাজধানীর আদাবর থানা এলাকায় অবৈধ ভিওআইপি পরিচালনার অভিযোগে ২০১২ সালে করা একটি মামলার তদন্ত করেন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক মাহবুবুর রহমান তরফদার। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি অভিযোগপত্র দাখিল করেন তরিকুল ইসলামকে আসামি করে। কিন্তু বিটিআরসির অনুমোদন না নিয়ে অভিযোগপত্র দেওয়ায় মামলার বিচারকাজ প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। টেলিযোগাযোগ আইন অনুসারে ভিওআইপি মামলার অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার আগে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বিটিআরসির অনুমোদন নিতে হবে।

অভিযোগপত্র দেওয়ার পর মামলাটি বিচারের জন্য ওই বছরই ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠান ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত। মহানগর দায়রা জজ মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার বিশেষ জজ-১ আদালতে পাঠান। বিটিআরসির অনুমোদন না নিয়ে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ায় মামলাটি আবার মহানগর দায়রা আদালতে ফেরত পাঠান বিচারক। মামলাটি সেখানেই পড়ে আছে। বিটিআরসির অনুমোদন ছাড়া এ রকম ৪০টির মতো মামলা ঝুলে আছে।

ঢাকা মহানগরের বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে ৯৩টিতে সাক্ষী না আসার কারণে একটিরও নিষ্পত্তি হয়নি। এসব মামলায় এক হাজার ৩৯৫ জন সাক্ষীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও কাউকেই আদালতে হাজির করতে পারেনি সরকারপক্ষ।

এ ছাড়া ৪৬টি ভিওআইপি মামলা পুলিশ তদন্ত করছে। কয়েক বছর ধরে তদন্ত চললেও প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে না। এসব মামলায় ৯৩০ জন আসামি জামিনে আছেন।

বিটিআরসির লাইসেন্স ও আইন শাখার পরিচালক (আইন) তারেক হাসান সিদ্দিকী বলেন, জনবলসংকটের কারণে বেশ কিছু মামলার তদন্ত প্রতিবেদন সময়মতো দেওয়া সম্ভব হয়নি। শিগগিরই দেওয়া হবে। বিটিআরসির অনুমোদন ছাড়া পুলিশের অভিযোগপত্র দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ এটা ভুল করছে। ভিওআইপি মামলাগুলোতে বিটিআরসির প্যানেল আইনজীবী না থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে কমিশন ভাবছে।

আসামিদের আদালতে হাজির করতে না পারা প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আনিসুর রহমান বলেন, ‘মামলার কাগজপত্র না দেখে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’

তত্ত্বাবধায়ক আমলে নিষ্পত্তি: বিটিআরসি সূত্র জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ২২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি বিটিআরসি এবং চারটি পুলিশের করা মামলা। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রায় সব মামলাই নিষ্পত্তি হয়েছে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ওই সব মামলায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মূল হোতাদের ধরা হয়নি। শুধু জরিমানা করেই এসব মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে৷

আইনের দুর্বলতা: টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন থাকার পরও অপরাধীদের শাস্তি দিতে না পারার কারণ হিসেবে আইনের দুর্বলতাকে দায়ী করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। টেলিযোগাযোগ আইন বিশেষজ্ঞ তানজীব-উল আলম বলেন, এ আইনে যেসব শাস্তির কথা বলা হয়েছে, সেগুলো শুধু লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য।

সফল অভিযানও ব্যর্থ: অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার কারণে সরকার গত পাঁচ বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে বলে ধারণা টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের; যা দেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক। আর কল চুরি থেকে পাঁচ বছরে ভিওআইপি সিন্ডিকেটগুলো হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এটি পদ্মায় মূল সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের সমান।

এ হিসাবটি মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর নিজস্ব গবেষণা ও টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে। বৈধ পথে আসা আন্তর্জাতিক কলের হিসাব আর আন্তর্জাতিক সংযোগ যোগাযোগকারী প্রতিষ্ঠানের (ক্যারিয়ার) হিসাবের মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা এ তথ্য বের করেছেন। প্রায়ই দেখা যায়, বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী বৈধ পথে আসা আন্তর্জাতিক কলের হিসাবের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের হিসাবে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিটিআরসির তথ্য অনুসারে, জুন ও জুলাই মাসে প্রতিদিন গড়ে বৈধ আন্তর্জাতিক কল এসেছে প্রায় পাঁচ কোটি মিনিট। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের হিসাবমতে, এই সময়ে প্রতিদিন গড় কলের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি মিনিট।

র‍্যাবের গণমাধ্যম ও আইন শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, গত পাঁচ বছরে অবৈধ ভিওআইপির বিরুদ্ধে ৩৩৮টি অভিযান পরিচালনা করেছে র‍্যাব। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৯৭ জনকে। এসব অভিযান শেষে মামলা হয়েছে ২৯৩টি। পাশাপাশি বিটিআরসি ও পুলিশও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেছে।

বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির বড় ক্ষতি করা অবৈধ এ ব্যবসা বিটিআরসি,র‍্যাব-পুলিশের নিয়মিত অভিযানের পরও বন্ধ করা যাচ্ছে না। অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সরঞ্জামসহ লোকজনকে গ্রেপ্তার করলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রকেরা। বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার হওয়ার পর শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও জামিন পাওয়ার নজির রয়েছে।

কর্নেল জিয়াউল আহসান এ বিষয়ে বলেন, এরা এতটাই শক্তিশালী যে আটক করলেও ধরে রাখা কঠিন।

সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ ভিওআইপিবিরোধী সবচেয়ে বড় অভিযান হয় গত বছরের ২২ ডিসেম্বর রাজধানীর উত্তরায়। তখন তাইওয়ানের ৩২ জন এবং পাঁচজন চীনা নাগরিকসহ ৪৩ জনকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। টেলিযোগাযোগ আইনে সব অপরাধই জামিনযোগ্য হওয়ায় শুরু থেকেই তাঁদের ছাড়িয়ে নিতে তৎপর ছিল প্রভাবশালী একটি মহল। সেটা ঠেকাতেই এজাহারে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের একটি ধারা যোগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী র্যা বের সহকারী পুলিশ সুপার কাজেমুর রশীদ। একটি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মুঠোফোন প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ ভিওআইপির কারণে রাষ্ট্রের পাশাপাশি মুঠোফোন কোম্পানিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হলেও কার্যকর কিছুই হচ্ছে না। তানজীব-উল আলম বলেন, সবারই ধারণা, এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা জড়িত। সরকার আন্তরিক হলেই এ ব্যবসা বন্ধ করতে পারে এবং অপরাধীদের বিচার করতে পারে।

Share this post

scroll to top
error: Content is protected !!