DMCA.com Protection Status
ADS

“উনিশ শ একাত্তর”,মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারনমূলক প্রামান্য ধারাবাহিকঃসাইদুল ইসলাম,পর্ব-১২

10167945_10203543240170746_843595010_aউনিশ শ’ একাত্তরঃ ১২

সাইদুল ইসলাম

 

 

২৫ মার্চ জয়দেবপুর থেকে ফিরে ব্রিগেডিয়ার আবরারের বাসায় উঠেলেন মজুমদার। জয়দেবপুরে যাবার আগেই তিনি বুঝেছিলেন, যে কথা বলে তাঁকে ঢাকায় উড়িয়ে আনা হয়েছে, তা পুরোপুরি ঠিক নয়। তাই সকালে তিনি ক্যাপ্টেন আমীনকে চট্টগ্রাম ফিরে যেতে বলেছিলেন। 

তিনটার দিকে আবরারের সাথে দেখা হলো, ভালো করে কথা হলোনা। আবরারকে মনে হলো ভীষণ ব্যস্ত। অথবা তিনি তাঁকে এড়িয়ে যেতে চাইছেন। মজুমদার বললেন, ‘দোস্ত, আনসারি যদি টেকওভার করে থাকে, তাহলেতো আমার চট্টগ্রাম যাওয়া দরকার। বউ বাচ্চাদের আনতে হবে’
– তুই এত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? আগে পোষ্টিং কোথায় হয় দ্যাখ।
– পোষ্টিং যেখানেই হোক, চিটাগাং এ হবার তো কোন চান্স নেই। হোয়াই সুডন্ট আই গেট রেডি টু মুভ?
– তাও আমি বলবো, ওয়েট ফর দ্য পোষ্টিং অর্ডার। 
মজুমদার কে আর কোন সুযোগ না দিয়ে, ইউনিফর্ম পরে গট গট করে, গাড়িতে উঠে কোথাও চলে গেলেন তিনি। মজুমদার হঠাত খেয়াল করলেন, কমান্ডারের বাসায় গার্ডের সংখ্যা আগের দিনের চেয়ে বেশি। দরকার না হলেও মেস ওয়েটাররা তারঁ রুমের চারপাশে ঘুর ঘুর করছে। ‘ আমাকে হাউস এরেস্ট করেনিতো?’ মনে মনে ভাবলেন তিনি। সাথে সাথে মনে হল, এখানে আর এক মুহুর্তও থাকা যাবে না। সন্ধ্যার দিকে এক ফাঁকে তিনি বাড়ি থেকে বেরহয়ে ধানমন্ডিতে তাঁর ভাই সাজ্জাদ আলী মজুমদারের বাসায় চলে এলেন। 
সেখানে দেখা হলো ক্যাপ্টেন আমীন আহমেদ চৌধুরির সাথে। সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে তিনি এখানে এসেছিলেন ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের সাথে দেখা করার আসায়। সপ্তাহ দেড়েক আগে আরেকবার তাকে এই বাসায় আসতে হয়েছিলো, রিটায়ার্ড বাঙালি সেনাসদস্যদের নামের তালিকা নিয়ে। তালিকাটা পৌছে দেয়ার কথা ছিলো কর্নেল ওসমানীকে। ওসমানীর পেছনে ফেউ লাগিয়ে রেখেছিলো পাকিস্তানীরা। শেষ মুহুর্তে ওসমানীর পরামর্শে আমীন তালিকাটা মিসেস সাজ্জাদ আলী মজুমদারের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। 
ব্রিগেডিয়ার মজুমদার, আমীনকে দেখে খুশি হলেন না। “তোমাকে না চিটাগাং চলে যেতে বলেছিলাম? ওখানে এখন আমাদের অনেক কাজ”। আমীন বললেন, “ আমি তো স্যার, যেতেই চেয়েছিলাম, তবে চট্টগ্রামে পরিস্থিতি আরও খারাপ, রাস্তাঘাটে ব্যরিকেড, গাড়ি ঠিকমত চলছে না”। কিছুক্ষণ কোন কথা হলো না দু’জনের। নিরবতা ভাঙ্গলেন আমীন, ‘স্যার, আপনি বললে, আমি এখনই রওনা হয়ে যাই’। একটু খানি ভেবে, মজুমদার বললেন, তোমার ভাবীরা রয়েছে, আমাকে তো যেতে হবেই দেখি, দেরী যখন হলোই, দেখি কর্ণেল ওসমানী কী বলেন’। 

তাজউদ্দিন আহমেদ, ওসমানী, জহুর আহমেদ চৌধুরি, সবার বাসা মোটামুটি একই এলাকায়। মিসেস সাজ্জাদ আলী মজুমদারকে পাঠানো হলো তাজউদ্দিনকে খবর দিতে। তিনি ফিরে এসে জানালেন, ‘তাজ উদ্দিন ভাই বেরিয়ে গিয়েছেন’। ওসমানী এলেন একটু পর। মজুমদার বললেন, ‘স্যার অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে, আমি তিন বার খবর পাঠিয়েছি, একবার ক্যাপ্টেন আমীন এসেছেন, একবার সিদ্দিকী সাহেবকে পাঠানো হয়েছে, আর একবার তো আমি নিজেই জানালাম, They are only buying time in the name of negotiation. My sources say, the West Pakistani Generals will never allow Sheikh Shaheb, to be in power. The Army will go for action soon. We could win easily if we had gone for action a few days ago. If Sheikh Mujib permits, it is still possible to do something.” 

ওসমানী বললেন, “No, Sheikh Mujib does not want that. He wants to resolve the crisis through political dialogue.” He said, “You want to revolt, but do you have the arms to do so?”

মজুমদার বললেন,আমি অফিসারদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। এখনও আমাদের যে জনবল আছে, কোত আর এম্যুনিশন ডিপোগুলি দখল করে নিয়ে, পশিচমাদের বিপদে ফেলে দেওয়া যায়। চিটাগাং হতে পারে তার জন্যে সবচে’ ভালো যায়গা। চিটাগং দখলে নিয়ে, শুভপুর ব্রিজের ওপাশ থেকে সারা দেশ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যায়। পশ্চিমারা যদি এরপর আর সৈন্য উড়িয়ে না আনতে পারে তাহলে তাদের পক্ষে আর কিছুই করা সম্ভব হবে না। 

ওসমানী বললেন, ঠিক আছে, চলো আমরা, শেখ সাবের বাসাত গিয়া উনারে আরেখটু বুঝাইয়া কই’ । মজুমদার রাজী হলেন। ওসমানী কি যেন ভাবলেন, তারপর বললেল, ‘ না থাউক কা, দুই জনে এখ লগে যাওয়া, ঠিক অইতো না, we are under surveillance, তুমি একানেও তাকিও, আমি আগে যাই দেখি উনি কী বলেন, পরে তুমারে দরখার লাগলে তুমারে জানামু’। 

সাড়ে আটটার সময় ডঃ ফরাসঊদ্দিনের বাসা থেকে ফোন করলেন ওসমানী। বেশি আলাপ হলোনা। তিনি বললেন, শেখ সাহেবের সাথে প্রেসিডেন্টের আলোচনা সফল হয়েছে। তিনি তোমাকে ধৈর্য ধরতে বলেছেন।

মজুমদার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তাঁর মনে হলো, শেখ সাহেব মারাত্মক কোন ফাঁদে পড়তে যাচ্ছেন। প্রথমে মনে হলো, স্ত্রী পুত্রদের কথা, আমীনের কথা শুনে মনে হয়েছে, চিটাগাঙের অবস্থা ঢাকার চেয়ে খারাপ। আবরারের সাথে একবার কথা বলতে পারলে ভালো হত, সে অনেক কিছু জানে। কিন্তু আকবার পাল্টা অনুযোগ করতে পারে তাঁকে না বলে চলে আসার জন্য। আর শশুরবাড়ি গেণ্ডারিয়াতে, চলে যাওয়া যায়। তবে বউবাচ্চার খবর না নিয়ে তিনি সেখানে যেতে চাননা। বাসাথেকে বেরিয়ে আনমনে হাটতে হাটতে বেশ কিছু দূর চলে এসেছিলেন তিনি। কলাবাগানের কাছে পৌছাতেই একজন মানুষকে লিফলেট বিলি করতে দেখলেন তিনি। অনেক লোক আগ্রহ নিয়ে পড়ছে সেই লিফলেট। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার লিফলেট হাতে নিয়েই বুঝে গেলেন তাঁর আর কোন আশ্রয় নেই। শেখ মুজিব স্বাক্ষরিত এই ইস্তেহারে বলা হয়েছে, “প্রেসিডেন্টের সহিত আমাদের আলোচনা শেষ হয়েছে।ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। আশা করি প্রেসিডেন্ট এবার তাঁর ঘোষণা করবেন”। 

সূত্রঃ ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের সাথে আলাপচারিতা, ১৯৯৯, মেজর জেনারেল আমীন আহমেদ চৌধুরি, স্মৃতিচারণঃ অগ্নিঝরা মার্চ ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলো, মাহাবুব উল আলামঃ রক্ত আগুণ অশ্রু জল স্বাধীনতা

Share this post

scroll to top
error: Content is protected !!