২০২২ সালে বিএনপির ওপর আওয়ামী নিপীড়ন—সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক দমননীতির বছর

এস এম মাঈন উদ্দিন (৫ জানুয়ারি ২০২৩):

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২২ সাল একটি সংঘর্ষপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সারাদেশে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বাধা, পুলিশি হামলা, গ্রেপ্তার এবং রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের দলীয় ব্যবহার বিএনপির ওপর নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে।

এই প্রতিবেদনটিতে ২০২২ সালের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি, তারিখ, এবং সংশ্লিষ্ট মন্তব্যসহ বিএনপির ওপর নিপীড়নের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ নিম্নে দেওয়া হলঃ

 

জুলাই: ভোলায় গুলিতে নিহত ২

২০২২ সালের ৩১ জুলাই, ভোলায় বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে আব্দুর রহিমনূরে আলম নামের দুই কর্মী নিহত হন। এই ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে।

  • মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “সরকার দলীয় কর্মী ও পুলিশ দিয়ে বিরোধী দলের কর্মসূচিতে আক্রমণ করাচ্ছে। পুলিশ এখন কথায় কথায় গুলি করছে”।

এই ঘটনার পর বিএনপি সারাদেশে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে, কিন্তু প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়।

 

সেপ্টেম্বর: নারায়ণগঞ্জে সংঘর্ষ ও নিহত

১ সেপ্টেম্বর, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নারায়ণগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। একই দিনে কুমিল্লা, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

  • আওয়ামী লীগের মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, “বিএনপি সহিংসতার দিকে চলে গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হবে সেটাই স্বাভাবিক”।

বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে সহিংসতায় পরিণত করছে।

 

অক্টোবর–ডিসেম্বর: বিভাগীয় সমাবেশে বাধা

অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএনপি সারাদেশে বিভাগীয় গণসমাবেশের আয়োজন করে। তবে এসব কর্মসূচিতে সরকার নানা বাধা সৃষ্টি করে।

  • সড়ক, নৌ ও রেলপথ বন্ধ করে নেতাকর্মীদের সমাবেশে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হয়।

  • বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, মাঠে পুলিশ মোতায়েন, এবং গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়।

১০ ডিসেম্বর, ঢাকার গোলাপবাগ মাঠে বিএনপি বড় সমাবেশ করে এবং ১০ দফা দাবি ঘোষণা করে।

১৯ ডিসেম্বর: ২৭ দফা রূপরেখা ঘোষণা

১৯ ডিসেম্বর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৭ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেন, যেখানে রাষ্ট্র সংস্কার, নিরপেক্ষ নির্বাচন, এবং দমননীতির অবসান চাওয়া হয়।

  • “বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকার রাষ্ট্র কাঠামোকে ভেঙে ফেলেছে। জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে হবে”—মির্জা ফখরুল

 

নিপীড়নের ধরন ও কৌশল

বছরজুড়ে বিএনপির ওপর আওয়ামী লীগের নিপীড়ন ছিল বহুমাত্রিক:

নিপীড়নের ধরন বিবরণ
পুলিশি হামলা শান্তিপূর্ণ সমাবেশে লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, গুলি
গ্রেপ্তার ও মামলা শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, সন্ত্রাসের মামলা
প্রশাসনিক বাধা সমাবেশে বাধা, যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা
মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ বিরোধী মতের প্রচারে বাধা, সাংবাদিকদের হয়রানি
রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের ব্যবহার পুলিশ, বিচার বিভাগ, প্রশাসনকে দলীয়ভাবে ব্যবহার

 

বিশ্লেষণ ও মন্তব্য

সেলিমা রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, “আওয়ামী লীগ দেশের পুলিশ, বিচার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবাইকে অর্থসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কুক্ষিগত করে ফেলেছে”।

অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, “বিএনপির নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং সরকারের ভয়ংকর দমননীতি আন্দোলন ব্যর্থতার কারণ”।

 

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াঃ

  • Human Rights Watch: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

  • EU ও UN: শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।

২০২২ সালের রাজনৈতিক উত্তেজনার মূল কারণ ছিল আসন্ন জাতীয় নির্বাচন। বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে, যা আওয়ামী লীগ প্রত্যাখ্যান করে।

  • বিএনপির দাবি: “নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ছাড়া সুষ্ঠু ভোট সম্ভব নয়।”

  • আওয়ামী লীগের অবস্থান: “সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে।”

এই দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করে এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

২০২২ সাল ছিল বিএনপির জন্য এক দুঃসময়, যেখানে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগের দমননীতি, পুলিশি হামলা, এবং রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের দলীয় ব্যবহার বিরোধী রাজনীতিকে সংকুচিত করেছে। এই পরিস্থিতি দেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সহনশীলতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

Share this post

scroll to top