DMCA.com Protection Status
ADS

বিএনপির রুপকল্প ভিশন-২০৩০ সর্বমহলে ব্যপক প্রশংসিত।

ক্যাপ্টেন(অবঃ)মারুফ রাজুঃ  আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’ বা রূপকল্প ২০৩০ দেশব্যাপি ব্যপক প্রশংসা কুড়িয়েছে ।

তবে ৩৭টি বিষয়ে মোট ২৫৬ দফা প্রস্তাব বাস্তবায়ন করাই দলটির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

কারণ এই রূপকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় যেতে হবে। আর ক্ষমতায় গেলে দলটির নীতিনির্ধারণী ভূমিকা বা মন্ত্রিসভায় কারা থাকেন সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনও দলটির নেতৃত্বের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। 

দলীয় সূত্রে জানা যায়, নেতাদের মধ্যে দলাদলি থাকায় ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেও বিএনপি সংসদের একজন উপনেতা নির্বাচন করতে পারেনি। আবার একই কারণে ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলের আসনে বসেও দলটি নির্বাচন করতে পারেনি সংসদের একজন উপনেতা। ২০০১ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েও দলটি বাড়াতে পারেনি জাতীয় সংসদের আসন।

 

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, নানা মত ও পথের দল বিএনপির অভ্যন্তরে সব সময় কোন্দল লেগে থাকে। সেই সঙ্গে নানা শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নে তত্পর থাকেন দলটির নেতারা। ফলে তাঁরাই দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ‘বিভ্রান্ত’ করেন। একেক সময় একেক নেতা বা বলয় বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বিএনপির দুর্বলতা প্রকাশ পায় এবং আটকে যায় নানা সিদ্ধান্ত। আর এভাবেই দলটি সরকারে, এমনকি বিরোধী দলে থেকেও পেছাতে থাকে।

সর্বশেষ উদাহরণ হলো দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দলের একাংশের আপত্তির কারণে ওই প্রস্তাবটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। চিন্তা ছিল বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পেশাজীবী ও বিশিষ্ট নাগরিকদের মনোনয়ন দিয়ে উচ্চকক্ষে নেওয়া হবে।উন্নত বিশ্বে কানাডা,ব্রিটেন সহ বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থার সুফল পাচ্ছেন ঐসব দেশগুলো।

জানা যায়, দেশের নাগরিক সমাজকে সরকার পরিচালনায় সম্পৃক্ত বা অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পরামর্শেই নেওয়া হয়েছিল। একইভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি না করার ঘোষণাও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পরামর্শেই দেওয়া হয়েছে। ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের ব্যাপারে তত্পর দেশগুলোর মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে, ক্ষমতায় গেলে বিএনপি প্রতিশোধপরায়ণ হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়িয়ে, নাকি অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে, সেটি নিশ্চিত নয়।

তবে ক্ষমতায় গেলে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ সৃষ্টি করে কিছুটা ভারসাম্য আনার বিষয়ে বিএনপির মধ্যে আলোচনা আছে। জিয়াউর রহমানের শাসনকালে উপপ্রধানমন্ত্রীর দুটি পদ থাকলেও ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ওই পদ বিলুপ্ত করে দেয়।

ওই সময় বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের বদলে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।

বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী মনে করেন, প্রস্তাবগুলোর মধ্যে অনেক কিছু ভালো থাকলেও এটিকে আরো যুগোপযোগী করা যেত।

যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে আরো যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ স্পষ্ট করে সেটিকে ১ নম্বর অগ্রাধিকারমূলক খাত ঘোষণা করা উচিত ছিল। রূপকল্প ২০৩০ বিএনপি বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না—জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতি থাকতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হলে খুশি হতাম। জাতিও তাতে উপকৃত হতো। কিন্তু ভবিষ্যতে এ প্রশ্নে সংবিধান সংশোধনের জন্য মনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার। সেটি বিএনপি পারবে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। ’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপির রূপকল্পে অনেক ভালো কথা থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়নে প্রথমত দীর্ঘ সময় লাগবে। দ্বিতীয়ত, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া দলগতভাবে বিএনপির দক্ষতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত এ সুধীজন।

সরকারে ও বিরোধী দলে থাকাবস্থায় একজন উপনেতার নির্বাচন না করতে পারার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শত নাগিরিক কমিটির আহ্বায়ক প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘তখনকার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন ছিল এবং বিএনপির অভিজ্ঞতারও কিছুটা অভাব ছিল। কিন্তু অনেক ধাক্কা খেয়ে পরিস্থিতির এখন উন্নতি হবে বলেই আমরা প্রত্যাশা করি। ’

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অবশ্য মনে করেন, বিএনপি সত্যিকার অর্থে আন্তরিক হলে রূপকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন কাজ নয়। তিনি বলেন, ‘সময় বেশি নিলেও বিএনপি ভালো প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। এর প্রমাণ হলো আওয়ামী লীগ বলেছে, বিএনপি তাদের নকল করেছে। তো পরীক্ষায় নকল ছাড়া বাকি সব ভালো বিষয়ে নকল করা তো খারাপ না। ’

এক প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট এ মুক্তিযোদ্ধা বলেন, রূপকল্পে কিছু ক্ষেত্রে শূন্যতা রয়েছে। একমাত্র দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার বিষয় ছাড়া স্থায়ী কমিটি এতে তেমন কোনো ভূমিকা পালন করেনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মতে, কঠিন কাজ বাস্তবায়ন করাটাই চ্যালেঞ্জ, স্বাভাবিক বা সাধারণ কাজ করতে চ্যালেঞ্জের প্রয়োজন হয় না। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অতীতে দু-একটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতা বা দেরিতে সিদ্ধান্ত থাকতে পারে। কিন্তু এবার বিএনপি বুঝেশুনেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। সময় হলে জনগণ এর বাস্তবায়ন দেখতে পাবে। ’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমদুর রহমান মান্নার মতে, ‘ভিশন বা রূপকল্প দেওয়ার এই যে চর্চা শুরু হয়েছে, সেটি প্রশংসনীয়। কারণ এটি একটি রাজনৈতিক দলকে এক ধরনের জবাবদিহির মধ্যে ফেলবে। জনগণ বলতে পারবে বিএনপি এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাবও প্রশংসা করার মতো। আমরা আশা করব, এ প্রশ্নে সংবিধান সংশোধন করে তাকে যতখানি গণতান্ত্রিক করা যায় সেই প্রচেষ্টা বিএনপি ভবিষ্যতে করবে। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে এখনই মতামত দিতে রাজি নই। তবে দলটির অতীত ভূমিকা সে ধরনের ইঙ্গিত দেয় না। তাই এগুলো বাস্তবায়নে সক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে দলটির থাকতে হবে। ’

বিএনপির রূপকল্প নিয়ে গত দুই দিনে আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সুধীসমাজের মধ্যেও গুরুত্ব পায়। বলা হয়, রূপকল্পের সব কথাই ভালো। কিন্তু এর বাস্তবায়ন কতখানি সম্ভব, তা নিয়ে নানা আলোচনা ঘুরপাক খায় সর্বত্র।

তবে শুধু রূপকল্প তুলে ধরে বা গোঁজামিল দিয়ে আগামীতে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়—এটি এখন বিএনপি নেতাদেরও উপলব্ধি বলে দলটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতা  জানান, ঘোষিত রূপকল্প নিয়ে সুধীসমাজ ও জনগণের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে তাঁরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান। তবে এর আগে প্রতিটি বিষয় বা ইস্যুতে দলটির পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে সেমিনার করে জনমত সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আজ শনিবার সকালে লেডিস ক্লাবে শিক্ষাবিষয়ক একটি সেমিনার উদ্বোধন করবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

‘বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও আমাদের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এ সেমিনারের বিকেলে সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এতে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করবেন বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ওবায়েদুল ইসলাম।

Share this post

scroll to top
error: Content is protected !!