ক্যাপ্টেন(অবঃ)মারুফ রাজুঃ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় হাসিনা সরকার, বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই ব্যবহার করেছে তিন লাখের বেশি গুলি।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
এদিন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ ৭ নেতার বিরুদ্ধে পঞ্চম দিনের মতো প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়।
ট্রাইব্যুনালে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।
এ সময় চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, আবদুস সোবহান তরফদার, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, শাইখ মাহদী, মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর উপস্থিত ছিলেন।
যুক্তিতর্কে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে চায়না রাইফেল, পিস্তল, শটগান থেকে শুরু করে হেলিকপ্টার ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছোড়ার বিবরণ দেন প্রসিকিউটর তামিম।
তিনি বলেন, বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এর মধ্যে রয়েছে চায়না রাইফেল, ৭ দশমিক ৬২ মিমি. রাইফেল, পিস্তল, এলএমজি, এসএমজি, শটগান, রিভলভারসহ অন্যান্য অস্ত্র।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে মোট ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি খরচ করা হয়েছিল। শুধু ঢাকায় খরচ হয়েছে ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড। এছাড়া দেশের ৪১ জেলার ৪৩৮ স্থানে ঘটেছে হত্যাকাণ্ড। ৫০-এরও বেশি জেলায় ব্যবহৃত হয়েছে মারণাস্ত্র।
ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের শনাক্তের পর হেলিকপ্টারের মাধ্যমে গুলি ছোড়া হয়েছে বলে জানান প্রসিকিউটর তামিম। যুক্তিতর্কের শুরুতে এদিন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানের ভূমিকা নিয়ে বর্ণনা দেওয়া হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১১ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাদ্দামের একটি ফোনালাপ বাজিয়ে শোনানো হয়। ১৪ জুলাই কাদেরের উসকানিমূলক বক্তব্যের কিছু অংশ পড়ে শোনান এই প্রসিকিউটর।
তার দাবি, শীর্ষ নেতাদের ধারাবাহিক এসব উসকানিতে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হারে হামলা চালান আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাকর্মীরা।
এ সময় ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শিত ১৫ জুলাই ঢাবিতে হামলার একটি ভিডিওতে সেসব চিত্র ফুটে ওঠে। এছাড়া শেখ হাসিনার সঙ্গে ইনানের একটি ফোনালাপও বাজিয়ে শোনানো হয় ট্রাইব্যুনালে।
একই সঙ্গে ১৬ জুলাই প্রকাশিত বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরও তুলে ধরা হয়। তামিম বলেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগের সশস্ত্র হামলায় ১৫ জুলাই তিন শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। ধীরে ধীরে তাদের এমন হামলা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদকের নির্দেশে এসব নির্মমতা চালানো হয়।
তিনি আরও বলেন, ১৫ জুলাই ঢাবি এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীদের মধ্যে ছাত্রলীগ ছাড়াও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা ছিলেন। এমনকি আগের দিন রাতে টিএসসি এলাকায় অবস্থান নেন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ও যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল।
এ সময় ওই দিন রাতে দেওয়া আরাফাত ও নিখিলের আলাদা দুটি ভিডিও বক্তব্য প্রদর্শন করা হয়। ৪ আগস্ট প্রসিকিউশনের যুক্তি পর্ব শুরু হয়।
বুধবার চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এ পর্ব সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। এরপরই শুরু হবে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক। বর্তমানে এ মামলার সব আসামিই পলাতক রয়েছেন।

