বিএনপির বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচনী বিজয়কে বিতর্কিত করছে কারা???

মেজর(অবঃ)গোলাম মান্নান চৌধুরীঃ ১৯৯১ সনে চমক জাগিয়ে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া মেনে নিতে না পেরে, তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ঘোষনা দিয়েছিল, তারা বিএনপিকে একদিনের জন্য শান্তিতে থাকতে দিবেনা। তারা কথা রেখেছিল, বিএনপিকে তারা ৫ বছরে একটা মূহুর্ত স্বস্তি দেয়নি। পক্ষান্তরে বর্তমান বিরোধী দল, নির্বাচনের আগে থেকেই নির্বাচন পরবর্তী আন্দোলন শুরু করেছে। প্রথম কিছুদিন শীর্ষ নেতারা চুপ থাকলেও, গত দেড় বছরে, অপপ্রচারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যাবহার করা তাদের বিশাল বট বাহিনী, প্রথম থেকেই মাঠে ভিষন সরব ছিল। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের একজন নারী উপদেষ্টার দেওয়া সাধারণ একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে, কিছুদিন আগে তারা নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং এর মত হাস্যকর অভিযোগ এনে, নিজেদের ১৬৮ আসনে জেতার দাবীও করে বসেছিল। তাদের একজন আইনজীবী আবার আরও এককাঠি সরেস। তার ভাষ্যমতে শুধু নাকি পোষ্টাল ভোট কারচুপি না হলে, তারা ২০৩ টি আসন পেত। অথচ পোষ্টাল ভোট পরেছে মাত্র ১০,৬৩,৮৭৪ ( দশ লক্ষ তেষট্টি হাজার আটশত চুয়াত্তর) টি, এর মধ্যে বাতিল হয়েছে ৫৭,৮৯৮ টি। অর্থাৎ বৈধ ১০,০৫,৯৭৬ ( দশ লক্ষ পাচ হাজার নয়শত ছিয়াত্তর) টি ভোটের মধ্যে জামাত পেয়েছে ৪,৮৮,১১৪ এবং বিএনপি পেয়েছে ৩,২২,১৪৪ টি ভোট। প্রশ্ন হচ্ছে বাড়তি এই ১,৬৫,৯৭০ হাজার ভোট দিয়ে শাহরিয়ার কবির কিভাবে ৬৮ আসনের পরিবর্তে ২০৩ টি আসন দাবী করলেন, এই নিয়ে একটা সিরিয়াস গবেষনা করা এখন সময়ের দাবী। তাছাড়া বিদেশে পোষ্টাল ভোট নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি, কিভাবে একটি দল বিভিন্ন দুতাবাসে প্রেরণ করা সব ব্যালট পেপার নিজেদের আয়ত্বে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। যুক্তির খাতিরে মেনে নিলাম, একজন প্রবাসীর ভোট আরেকজন দিতে পারবে না, কিন্তু ভোট তো নষ্ট করা যায়, তাই না শাহরিয়ার সাহেব?

আজকের আলোচ্য বিষয় কোন একক ব্যাক্তিকেন্দ্রিক নয়, সামগ্রিক বিষয়বস্তুর উপর আলচনা করাই এই প্রয়াসের মূল উদ্দেশ্য। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে এবং এর চেয়েও বেশী ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসবে তা বিএনপি কেন, বিরোধী দলও জানত। বিএনপি ২২০ থেকে ২৩০ টি আসন পাবে, এমন বানী সমৃদ্ধ অসংখ্য অডিও-ভিসুয়াল বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়া খুজলেই, পাওয়া যাবে। অনুরুপভাবে, পত্রপত্রিকার আরকাইভ ঘাটলেও এর সপক্ষে পাওয়া যাবে অসংখ্য প্রামান্য দলিল। কারণ বিএনপির শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত, এবং এর প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তিন তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া উভয়ই, বাংলাদেশের রাজনীতির জনপ্রিয়তম দুই উজ্জ্বল জোতিষ্ক। তাই মানুষ তাদের ছেলের উপর আস্থা রাখবে, এটাই স্বাভাবিক। একই সংগে বিএনপির চাঁদাবাজি এবং দখলদারিত্বের বয়ানটা জামাত সত্যে মিথ্যায় যে উচুলয়ে বেঁধেছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার তাল কেটে যায়, কারণ মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, এটা ছিল একটা সমন্বিত কালো প্রচারণা বা Black Propaganda’ র অংশ। বিএনপিকে অজনপ্রিয় করে তুলতে, বিরোধীদলগুলি একটা সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা প্রস্তুত করে। তারা ঠিক করে, যেখানেই কোন অনাকাংখিত ঘটনা ঘটুক, আগে বিএনপির উপর দোষ চাপিয়ে দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে তারা মনোবিজ্ঞানের একটা সূত্র প্রয়োগ করে। মনোবিজ্ঞানের মতে, মানুষ যখন কোন বিষয় প্রথম শুনে, বেশিরভাগ মানুষ তা বিশ্বাস করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর প্রধান কারণ হল দুটি শক্তিশালী প্রভাবক এই বিশ্বাস স্থাপনের অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। প্রভাবক দুটি হল Anchoring Bias (অ্যাঙ্করিং বায়াস) এবং Illusory Truth Effect (ভ্রমাত্মক সত্য প্রভাব )। প্রথমে পাওয়া তথ্য আমাদের মস্তিস্কে “অ্যাঙ্কর” বা নোঙরের মত গেথে যায়, যা আমাদের পরবর্তী সকল বিচার বিবেচনাকে প্রভাবিত করে—যদি প্রথমে পাওয়া তথ্যটি মিথ্যাও হয়, তাহলেও। আরও দূর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হল, পরবর্তীতে সত্য তথ্য সামনে আসলেও আমাদের ব্রেইন প্রথমে নোঙর ফেলা মিথ্যা তথ্যটাকে, পুরোপুরি সংশোধন করতে পারেনা। এর সঙ্গে যদি Illusory Truth Effect যুক্ত হয় তাহলে সোনায় সোহাগা। Illusory Truth Effect হল এমন একটি মনস্তাত্বিক বৈশিষ্ট্য, যার ফলে প্রথম শোনা মিথ্যা তথ্যটি বারবার শোনার মাধ্যমে, মানুষ সেটাকে সত্য হিসাবে বিশ্বাস করে ফেলে, এবং পরে সত্যটি জানার পরও মানূষ সিদ্ধান্ত গ্রহন করার ক্ষেত্রে, মিথ্যাটার উপরই আস্থা রাখে। এর কারণ হিসাবে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রথম শোনা যে কোন তথ্য মানুষের মস্তিস্কে একটা Baseline বা ভিত্তিরেখা সৃষ্টি করে। এই ভিত্তি রেখাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে বার বার মিথ্যা তথ্যটি প্রচার করা হলে, একধরনের Ring of Truth বা সত্যের চক্র সৃষ্টি হয়। মানুষ এরপরে আসল সত্যটি শুনলেও, মিথ্যাটিকেই সত্য বলে ধরে নেয়। এর দুটো বাস্তব উদাহরণ হল, অনেকে বিশ্বাস করে বি এন পি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় এসেছে, এবং অনেক মহিলা সত্যি সত্যি জান্নাতের লোভে জামাতকে ভোট দিয়েছে।

আমি মনোবিজ্ঞানী তেমন দাবী করার ধৃষ্টতা আমার নেই। কিন্তু অনলাইনে মিথ্যা তথ্যের উপর ভিত্তি করে লাগামহীন বিএনপি বিরোধী প্রচারণা দেখে, স্বউদ্যোগে একটু পড়াশোনা করার চেষ্টা করলাম। পাঠকদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে বলে এবং আমি নিজে এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্য জ্ঞান রাখিনা বিধায়, বিষয়বস্তুর বেশী গভীরে প্রবেশ করা থেকে সচেতন ভাবেই বিরত থাকছি। তারপরও নিছক কৌতুহল বশত: আরও দুয়েকটা বিষয়ে আলোকপাত করার লোভ সম্বরন করতে পারছি না।
বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ক্ষেত্রে জামাত একটি আধুনিক রাশিয়ান মডেল ব্যাবহার করে,যাকে বলে Firehose of Falsehood, যার অর্থ দাঁড়ায় একটি মিথ্যা তথ্যকে বিভিন্ন মাধ্যমে, অবিরাম এবং দ্রুতগতিতে এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া, যেন মানুষের পক্ষে সত্য মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ না থাকে এবং বিভ্রান্ত মানুষ মিথ্যাটাকেই সত্য হিসাবে মস্তিস্কে প্রক্রিয়া বা Process করে ফেলে। উদাহরণস্বরুপ, বাংলাদেশ ভারত থেকে ২০০ টি বগি কেনার খবরটি এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যেন, বিএনপি সরকারে এসে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে। অথচ এই চুক্তিটি ২০২৪ সনের এবং এর অর্থদাতা প্রতিষ্ঠান ইউরোপিয়ান বিনিয়োগ ব্যাংক। অথচ বট বাহিনীর কল্যানে ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী এবং বি এন পির বিরুদ্ধে, মিথ্যা ফটোকার্ড বানিয়ে, মন্তব্যের ঘরে অসভ্যতার চূড়ান্ত প্রদর্শনী চলছে। একইভাবে বিএনপি বিদ্বেষে তারা সুচতুর ভাবে প্রয়োগ করছে Astroturfing পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে নিজ নিজ সংগঠনের আর্থিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায় পরিচালিত ইভেন্টগুলিকে, কৃত্রিমভাবে ব্যাপক জনমতের প্রতিফলন হিসাবে প্রচার করা হয়। যেমন শাহবাগ অবরোধ বা বায়তুল মোকাররমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজ নিজ দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের কর্মসূচিগুলিকে, জামায়াত এবং সমমনা দলগুলি সার্বজনীন হিসাবে প্রচার করছে। অথচ দায়ীত্বশীল বিরোধীদলের জন্য এই দূর্যোগকালীন সময়ে, রাজপথে না নেমে, ন্যূনতম সহনশীলতা দেখানো ছিল গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য্য। কিন্তু তারা তাদের অসময়োচিত এই দাবীগুলি অর্জনের জন্য বেছে নিয়েছে The Big Lie বা বড় মিথ্যা। মনস্তত্ববিদরা বলেন, একটা বড় মিথ্যাকে বার বার বলা হলে মানুষ ভাবে যে, এত বড় মিথ্যা বার বার বলা সম্ভব না, তাই নিশ্চয়ই তারা সত্য কথা বলেছে। এই ফেনোমেনোনের সবচেয়ে বড় প্রমান হল, কোন তথ্য প্রমান ছাড়াই- বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেনা, গুম খুনের বিচার করবেনা এবং গনভোটের ফলাফল বাতিল করে দিবে- মর্মে বিরোধীদলীয় অপপ্রচার।

অস্বিকার করার উপায় নাই, বয়ান সৃষ্টিতে বিরোধীদল বিশেষভাবে পারঙ্গম। বিএনপি ১৬ বছর রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছে, হাজার হাজার নেতাকর্মী গুম, খুন, অপহরণের শিকার হয়েছে, ৬০ লক্ষ নেতাকর্মী মামলায় জর্জরিত হয়ে আদালত এবং জেলখানার চৌহদ্দিতে ১৬ টি বছর ডান্ডাবেড়ি পরে কাটিয়ে দি্যেছে, পুরো জুলাই-আগস্ট জুড়ে রাজপথে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে, কিন্তু ৫ই আগস্টের পর হটাৎ পর্দার পিছনে থাকা গুটিকয় ছাত্রনেতা হয়ে গেল, গণঅভুথ্যানের নায়ক এবং মাস্টারমাইন্ড, তাদের মাতৃ সংগঠন হয়ে গেল আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দল। এই নিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত করতে, মাত্র ১০ দিনের মাথায় আওয়ামী লীগকে ছেড়ে বিএনপিকে আক্রমনের লক্ষ্যবস্তু বানানো হল এবং সুকৌশলে বিএনপিকে চাদাবাজি এবং দখলদারিত্বের সমার্থক বানিয়ে ফেললো। কিন্তু এই সময়ে অপপ্রচারকারীদের অনৈতিক কর্মকান্ডের অসংখ্য ভিডিও, খবর আমরা প্রতিনিয়ত দেখেছি, পড়েছি। রাজনৈতিক সুশীলতা দেখাতে গিয়ে বিএনপি যেগুলির অধিকাংশ ফায়দা লাভের জন্য ব্যাবহার করেনি। পক্ষান্তরে, বিএনপির অনলাইন দূর্বলতা/সুশীলতার সুযোগ নিয়ে তারা নিত্যনুতন বয়ান সৃষ্টি করে, তা অনুগত বট বাহিনীর মাধ্যমে ঝড়ের গতিতে প্রচার করেছে, উপরে বর্নিত এক বা একাধিক পদ্ধতিতে। ফল দাড়িয়েছে এই যে, জাতির বুকের উপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা আওয়ামী লীগকে সরাতে বিএনপির ১৬ বছরের অবদান, জুলাই-আগস্ট গন অভুথ্যানে একক বৃহত্তম দল হিসাবে বিএনপির রক্তক্ষয়ী অংশগ্রহন, আজকে এই জাতি ভুলতে বসেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে, প্রমান ছাড়াই এই বয়ান সৃষ্টিতে জামাত যেমন মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে , একইভাবে নির্বাচনকালীন নিজেদের অপকর্মগুলি তারা ঢেকে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অথচ নির্বাচনের পুরো সময়জুড়ে তাদের জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি নেওয়া, বিকাশে টাকা পাঠানো, ভোটের জন্য গ্রামের সহজ সরল মহিলাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মাথায় হাত রেখে শপথ করানো, বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের ভয় ভিতী দেখানো, নির্বাচনে প্রভাব খাটানোর জন্য টাকা সহ বিমানে ধরা পরা এবং নির্বাচনের পূর্ব রাতে নির্বাচনী কেন্দ্র দখল করার চেষ্টার মত, অমার্জনীয় অপরাধগুলি আজ বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে।

২০১৮ সনের মিথ্যা তথ্য বা অপপ্রচার নিয়ে এম আই টির প্রকাশিত একটা গবেষনার চমকপ্রদ ফলাফল, সবার জ্ঞাতার্থে তুলে ধরে লেখাটি শেষ করছি। গবেষনাটিতে ১,৬০,০০০ হাজার টুইটকারীর উপর একটি সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে, মিথ্যা তথ্য ৭০% বেশি রিটুইট করা হয় এবং সত্য তথ্যের চেয়ে মিথ্যা তথ্য ৬ গুণ দ্রুত ১৫০০ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। গবেষনাটি থেকে আরও প্রমান হয় যে, রাজনৈতিক মিথ্যাচার সবচেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়ায়। উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে যে, এই মিথ্যা তথ্য গুলির প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। অপপ্রচার শুধু মানুষের মতামত বদলায় না, আচরণও বদলে দেয়—যার প্রমান আমরা আমাদের অনেক পরিচিত মানুষের বদলে যাওয়া আচরনের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। প্রশ্ন হচ্ছে এই ক্রমবর্ধমান হিংসাত্মক অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বিএনপির করনীয় কী? গণমানুষকে সচেতন করাই হচ্ছে আপাতত সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা এবং এর জন্য প্রয়োজন হচ্ছে অসংখ্য নিবেদিতপ্রান এবং ওয়াকিবহাল নেতাকর্মী, যাদের সৃজন করার দায়িত্ব বিএনপির হাইকমান্ডের।

লেখকঃরাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

Share this post

scroll to top