ক্যাপ্টেন (অবঃ) মারুফ রাজু: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিরপ্রস্থানে দেশের ও বিএনপির রাজনীতির একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হল, তার বড় ছেলে তারেক রহমানই যে দলের নেতৃত্বে আসছেন তা অনেকটা অনুমিতই।
লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরা তারেক রহমান নেতৃত্বের দক্ষতায় দলে মায়ের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবেন?
বিএনপির ২০০১ সালের সরকারের সময়ে দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় হন তারেক রহমান, চেষ্টা চালান তৃণমূলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরির; এক-এগারোর সময়ে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে চলে যান নির্বাসনে।
নির্বাসিত জীবনে ভিডিও কনফারেন্সে সম্পৃক্ত ছিলেন দলীয় কার্যক্রমে; এরপর মা খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে কারান্তরীণ হলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়ে কার্যত দলীয় প্রধানের দায়িত্ব আসে তার কাঁধে।
এর মধ্যে দুর্নীতি আর একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলাসহ বহু মামলায় সাজা হয়েছে তার; চব্বিশের অভ্যুত্থানে পালাবদলের খালাস পেলেন সেসব থেকে।
অতীতকে সঙ্গী করে কিংবা পেছনে পেলে নিজের মতো করে দলকে গুছিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জও তার সামনে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া দেশের নয়া রাজনৈতিক পটভূমিতে বিএনপিকে নিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার প্রথম চ্যালেঞ্জও একেবারে দোরগোড়ায়।
খালেদা জিয়ার অভিভাবকত্ব হারানো বিএনপির জন্য ধাক্কা হিসেবে এলেও তারেক আগে থেকে নেতৃত্বে থাকায় সেটা সামাল নিতে অসুবিধা না হওয়ার কথা বলছেন লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা যদি বড় ক্যানভাসে চিন্তা করি, এটা শূন্যতা থাকে না, এটা পূরণ হয়ে যায়। ধাক্কা আছে, কিন্তু এটা পূরণ হয়ে যায়। শূন্যতা পূরণ করেছেন শেখ হাসিনা, জিয়াউর রহমানের শূন্যতা পূরণ করেছেন খালেদা জিয়া।
“কেউ একেবারে অপরিহার্য না। সুতরাং সমস্যা নাই। হয়ত সাময়িক একটা ধাক্কা পাওয়া গেছে, কিন্তু খালেদা জিয়াতো কয়েক বছর যাবতই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। দলটাতো ছিল ভাইস চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নেতৃত্বে। এখন তিনি দেশে এসেছেন, তিনি নেতৃত্ব দেবেন সামনে থেকে।”
সপ্তাহখানেক আগে দলীয় নেতাকর্মীদের বিপুল সংবর্ধনায় যখন তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন, পাঁচদিন পরে হারিয়েছেন মাকে। মায়ের রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও নীতি নির্ধারণী নেতৃত্ব নিয়েই শুরু করতে হবে তারেক রহমানকে। তবে পুরনো ছাঁচে না থেকে এখানেও তাকে নিজের মতো করে পথ করে নেওয়ার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনীতির বিশ্লেষক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলছেন, খালেদা জিয়ার যে টিম ছিল, সেটা পুরোপুরি তার নিজের টিম। তারা তাকে সাহায্য করতেন, তারা তাকে পরামর্শ দিতেন, সেই পরামর্শ অনুযায়ী অনেক কিছুই হয়েছে। অনেক নীতিগত সাফল্য সেটা থেকে এসেছে।
“বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে, উনি সবসময় ঠিক অ্যাকাডেমিক আমি বলব না, তবে পলিসিগুলো তৈরি করার ক্ষেত্রে যাদের সাহায্য নিলে লাভ হয়, যারা আসলে কোনো বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারেন, এরকম লোকজনকে উনি বাছাই করেছেন।”
খালেদা জিয়ার সেই টিম বয়স আর প্রজন্মের পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সেই টিমটাও আস্তে আস্তে ডিসমেন্টেল হয়ে যাচ্ছে, কিছুটা বয়সের কারণে, কিছুটা ‘টাইম চেঞ্জ’ হচ্ছে, সেই ‘টাইমের’ সাথে টিকে থাকার কারণে, কিছুটা হচ্ছে নতুন যে ‘জেনারেশন’ আসছে, তার প্রয়োজনের কারণে।”
তারেক রহমানের সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ থাকার কথা তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “এক. তাকে তার নিজের মতো করে একটা টিম গড়ে তুলতে হবে, যেই টিমটাকে উনি বিশ্বাস করতে পারবেন, যে টিমের পরামর্শে উনি আস্থা রাখতে পারবেন, যে টিম অযৌক্তিক কথাবার্তা বলবে না, যুক্তিসঙ্গত কাজগুলো করবে।
“দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, ওনাকে ওনার মায়ের মতোই, মানে এই ঠিক পরামর্শ যেইটা সেই জিনিসটাকে হচ্ছে গিয়ে গ্রহণ করার মানসিতা থাকতে হবে। আমার কাছে, এই দুইটা জিনিস আমার কাছে প্রধান মনে হয়।”
বুধবার খালেদা জিয়ার জানাজায় বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তৃতায় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, প্রয়াত নেত্রীর জীবনসংগ্রামকে সামনে রেখে তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে চান তারা।
“ইনশাআল্লাহ, আমরা জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যাব; দেশনেত্রীর মতোই গণতন্ত্র, শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে জনগণের কল্যাণের লক্ষ্য স্থির রেখে। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।”
যেভাবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে তারেক
বিএনপির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেকের জীবনীতে লেখা হয়েছে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি তার মায়ের সাথে রাজপথে আন্দোলনে যোগ দেন এবং ১৯৮৮ সালে দলের বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদান করেন।
এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনি প্রচারে মায়ের সঙ্গে জেলায় জেলায় তার যোগদানের কথা বলা হয় সেখানে।
জীবনীতে বলা হয়, “তিনি বগুড়ায় তৃণমূল থেকে নেতা নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিলেন, যেখানে বিএনপি শাখার একজন নির্বাহী সদস্য ছিলেন। ১৯৯৩ সালে বগুড়া জেলা ইউনিটে তিনি একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন, যেখানে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়।
“বগুড়ায় সফল সম্মেলনের পর তিনি অন্যান্য জেলা ইউনিটকে গণতান্ত্রিকভাবে নেতা নির্বাচন করতে উৎসাহিত করেন।”
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে, তারেক রহমান স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা এবং সুশাসনের ওপর গবেষণা করার জন্য ঢাকায় একটি অফিস প্রতিষ্ঠা করার কথা লেখা হয়েছে সেখানে। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলেও সরকারি কোনো পদে আসেননি তিনি।
২০০২ সালে তারেককে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনীত করে দলের স্থায়ী কমিটি। ২০০৫ সালে দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন করেন এবং বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা ইউনিটের সাথে মতবিনিময় করেন।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার করা হয় তারেককে। এরপর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডনে পাড়ি জমান তিনি।
লন্ডনে থাকাবস্থায় ২০০৯ সালে তাকে সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে বিএনপি এবং ধীরে ধীরে বিএনপির পুনর্গঠনে যুক্ত হন তারেক রহমান। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার মা, দলের চেয়ারপারসন খালেদাকে কারাগারে পাঠানোর পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন তিনি।
লন্ডনে থেকে ভিডিও কনফারেন্স করে যোগাযোগের মাধ্যমে দলের তৃণমূলকে সংগঠিত রাখা এবং দলীয় নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রেখে আসছিলেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার পর তিনি বলছেন, দেশ গড়ার জন্য একটি পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছেন ইতোমধ্যে, সেটা বাস্তবায়নে দেশবাসীর সহায়তা তিনি চান।
তার আগে ২০২৩ সালে রাষ্ট্র সংস্কারে ৩১ দফা উপস্থাপন করেন তারেক রহমান, যা নিয়ে দলটি এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছে।
বিএনপির দলীয় নেতৃত্বে সক্ষমতার প্রমাণ তারেক রহমান দিলেও বাইরের মানুষের সামনে নিজেকে চেনানোর সময় এখন তার সামনে থাকার কথা বলছেন অধ্যাপক আসিফ শাহান।
তিনি বলেন, “২০১৮ সাল বা এই সময়কালে ওনার নেতা বা দলের লোকজনের সাথে ওনার যোগাযোগ ছিল। উনি তাদের সাথে কাজ করেছেন। দেশের মানুষের কিন্তু এখন ওনাকে পুরোপুরি জানতে একটু বাকি আছে। আমরা সবাই এখনও জানি না।
“ওনার আরেকটা চ্যালেঞ্জ হবে এই জায়গাটা যে, দেশের মানুষের কাছে ওনার নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, তিনি কীভাবে ভাবছেন এবং এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় উনি ওনার মায়ের যেই নেতৃত্ব, সেটাকেই ঠিকঠাক মতো এগিয়ে নিতে পারবেন বা সেটাতে কী করতে পারবেন, সেটাকে প্রতিষ্ঠা করাও আমার মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ।”
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। দেশে তখন জরুরি অবস্থা। এক বছর পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তখনকার পিজি হাসপাতালে যান বড় ছেলে তারেক রহমানকে দেখতে। ছবি: ফিরোজ আহমেদ
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। দেশে তখন জরুরি অবস্থা। এক বছর পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তখনকার পিজি হাসপাতালে যান বড় ছেলে তারেক রহমানকে দেখতে। ছবি: ফিরোজ আহমেদ
নির্বাসিত জীবন, দেশে দণ্ডাদেশ
দেশে তখন জরুরি অবস্থা, ক্ষমতায় সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী।
তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ১৩ মামলা। যৌথ বাহিনীর হেফাজতে তাকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তারেক রহমানকে ভর্তি করা হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে।
এক বছর পর, ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের জামিনে মুক্তি পান তারেক। সেই রাতেই স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জায়মা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য’ লন্ডনে চলে যান তিনি। শুরু হয় নির্বাসিত জীবন।
এদিকে দেশে শুরু হয় বিএনপির দুঃসময়। ২০১০ সালে শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে উৎখাত হন খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি সংসদের বাইরে চলে যায়, রাজপথই হয় দলটির ঠিকানা।
বছরের পর বছর আন্দোলন চালিয়েও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হঠাতে পারেনি বিএনপি। ২০১৫ সালে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মৃত্যু হয়, যা ছিল তার জন্য বড় ধাক্কা। সেই বৈরী সময়েও তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারেননি।
এর মধ্যে তার পাসপোর্টের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। কয়েক ডজন মামলার আসামি তারেক তখন আদালতের দৃষ্টিতে পলাতক। তার পাসপোর্ট আর নবায়ন করা হয়নি। এক সময় শোনা যায়, তারেক যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন।
২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট তখনকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে শেখ হাসিনা গ্রেনেড হামলার শিকার হন। তিনি রক্ষা পেলেও ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে অবিস্ফোরিত গ্রেনেড।
২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট তখনকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে শেখ হাসিনা গ্রেনেড হামলার শিকার হন। তিনি রক্ষা পেলেও ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে অবিস্ফোরিত গ্রেনেড।
আওয়ামী লীগের সময়ে তারেকের বিরুদ্ধে আরো ৭২টি মামলা হয়। সব মিলিয়ে ৫টি মামলায় তার সাজার রায় আসে। এর মধ্যে ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় জজ আদালত। হাই কোর্ট বাংলাদেশে তার বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে যেদিন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়, সেদিনই বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেককে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এরপর প্রায় সাত বছর ধরে লন্ডন থেকে ভিডিও কলেই তিনি দল পরিচালনা করেন। আর দেশে ঝড়-ঝাপটা সামলে বিএনপিকে টিকিয়ে রাখেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীরসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা।
তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবনের এই সময়টাতে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি আর একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগকে ফলাও করে দেখাত আওয়ামী লীগ সরকার।
আবার ২০০৭ সালের সেনা-নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয় ‘হাওয়া ভবনকে’ ঘিরে তারেক রহমানের বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ বড় আকারে প্রচার পায়।
ওই কার্যালয়কে ‘দুর্নীতি ও বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র’ হিসেবে অভিহিত করে আসছিলেন বিরোধীরা। উইকিলিকসে মার্কিন গোপন নথি ফাঁস হওয়ার পর সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়, যেখানে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা ছিল তার ‘দুর্নীতিবাজ’ বড় ছেলে তারেক রহমানকে বাঁচানো।
ফাঁস হওয়া গোপন নথি অনুযায়ী, ২০০৫ সালের শুরুর দিকে তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাসকে এ কথা বলেছেন সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুখ্য সচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকী।
সিদ্দিকী রাখডাক না করেই বলেন, “বংশানুক্রমিক রাজনীতি উদীয়মান গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়।”
হাওয়া ভবনের দুর্নাম ঘুচিয়ে নিজের ভাবমূর্তি কতটা উজ্জ্বল করতে পারবেন তারেক রহমান?
বিএনপির বিরুদ্ধে দখলবাজি, চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে আনছে জামায়াত, যা কৌশল হিসেবে নির্বাচনি মাঠে প্রচার করছে বিরোধী পক্ষ। গণঅভ্যুানের পর চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়ানোয় বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ায় অভিযোগ এড়াতে পারছে না দলটি।
সেসব বিষয় মাথায় রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং দুর্নীতি কমানোর জন্য তহবিল ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ করার পরামর্শ দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন।
বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়ে তারেক রহমান খুব দ্রুত দলের নেতৃত্ব পর্যায়ে চলে আসেন প্রধানমন্ত্রীপুত্র হিসেবে এবং বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় বনানীর ‘হাওয়া’ নামে একটি বাড়ি, যা পরে ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিতি পায়।
“সেই বাড়িটি দুর্নীতি এবং বিকল্প ক্ষমতা কেন্দ্র হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করে অনেকটা। যা দেশে আলোচনা হয়েছে, বিদেশেও আলোচনা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমি বলব যে আগামী দিনের বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য, আপনার এই রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং দুর্নীতি কমানোর জন্য তাদের তহবিলের ব্যবস্থাপনা এগুলো আরও স্বচ্ছ করা উচিত।
“কে চাঁদা দিচ্ছে, কোথায় খরচ হচ্ছে ইত্যাদি, এই জিনিসগুলো বিএনপিসহ ভবিষ্যতে যদি আওয়ামী লীগও আমাদের দেশের রাজনীতিতে ফিরে তারাসহ; সব দল এই জিনিসগুলো যদি চর্চা না করে তাহলে আমরা একটা আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশ করতে পারবো না।”
দেশে ফেরা, সামনে কী
প্রায় দেড় যুগের নির্বাসন ভেঙে লন্ডন থেকে ২৫ ডিসেম্বর যখন দেশে ফিরলেন তারেক রহমান, তখন চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মাঠ তার সামনে।
প্রবল গণআন্দোলনের মুখে গত ৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সেখানেই আছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও অধিকাংশই এখনও আত্মগোপনে রয়েছেন।
এর মধ্যে একের পর এক মামলার আসামি করা হয়েছে শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতাদের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রাণদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া তিনি কারদণ্ড পেয়েছেন প্লট দুর্নীতির মামলাতেও।
আর কার্যক্রমে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করায় ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনও করতে পারছে না তারা।
তারেক যখন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিতে যাচ্ছেন, তখন দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াত এবারের নির্বাচনে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
এর মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা সমন্বয়কদের নেতৃত্বে ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপিও ঘর গুছানোর চেষ্টা করছে, ‘সমঝোতা জোটে’ সঙ্গী হয়েছে জামায়াতের।
বিএনপি ও জামায়াত আলাদা দুটো ‘সমঝোতা জোট’ গঠন করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছোট-বড় অনেক রাজনৈতিক দল এখন এই দুই প্রধান শক্তির বলয়ে বিভক্ত।
বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় এসেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), ইসলামী ঐক্যে জোট, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, এনপিপি ও গণঅধিকার পরিষদ।
বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খাঁন দল ছেড়ে ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী কয়েক মাস আগে থেকেই সমমনা আরও সাতটি দল নিয়ে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল।
আট দলের এই জোটে ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
সর্বশেষ তরুণদের দল এনসিপি, অলি আহমেদের এলডিপি এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) জামায়াতের এই জোটের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় এসেছে।
শেষ সময়ে জামায়াতের জোটে যাওয়ায় এনসিপি ছেড়েছেন বেশ কয়েকজন নেতা, তাদের কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন। কেউ আবার মনোনয়নপত্র নিয়েও জমা দেননি।
মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যায় জামায়াতের ভূমিকা এবং রাজনীতিতে দলটির ধর্মের ব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বক্তব্য দিয়ে আসছেন তারেক রহমান।
আবার জামায়াত যেখানে পরিচিত ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলকে এক ছাতার নিচে এনেছে, সেখানে বামপন্থী ও মধ্যপন্থী কয়েকটি দলকে কাছে টেনেছে বিএনপি।
এমন প্রেক্ষাপটে তারেকের নেতৃত্বে বিএনপি আরও উদারপন্থী অবস্থানে যাবে কি-না, সেই আলোচনা আছে রাজনৈতিক মহলে।
এ বিষয়ে বিশ্লেষক আসিফ শাহান বলছেন, “আমার মনে হয়, এটা ওইভাবেই থাকবে। এখানে আসলে খুব বেশি কোনো পরিবর্তন আমি এই মুহূর্তে দেখি না। আমার মনে হয় যে বিএনপি সবগুলোকে এক জায়গায়, বিএনপি একদম বামে সরে একদম খুব ‘লিবারেল পলিটিক্যাল পার্টি’ হয়ে যাবে, এটা আমার মনে হয় না।
“সেটা বিএনপির জন্য বা বিএনপির তৃণমূল দলকে সেটা হতে দেবে কি-না, আমার মনে হয় না। বিএনপি কিছুটা থাকবে এরকম, মানে আগে যেরকম ছিল।”
এক্ষেত্রে নারীর শিক্ষার ক্ষেত্রে বিএনপির একানব্বইয়ের সরকারের গৃহীত নীতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “সুতরাং, সেই ‘লিবারেল মাইন্ডসেটের’ সাথে তার যে ‘কনজারভেটিভ বেইজ’ আছে, সেটাকে মিশিয়েই বিএনপি চলবে বলে মনে হয়।”

