এস এম মাঈন উদ্দিন (১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯)
চাঁদাবাজিসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে অবশেষে পদ ছাড়তে হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলামের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ ঘিরে কয়েকদিন ধরে চলা আলোচনা-সমালোচনার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়।
অভিযোগ রয়েছে, শোভন ও রাব্বানী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের জন্য উপাচার্যের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। যদিও তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
তাদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—
- বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি
- অনৈতিক আর্থিক লেনদেন
- বিলাসী জীবনযাপন ও দায়িত্বে অবহেলা
- সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সময়মতো উপস্থিত না হওয়া
- ছাত্রলীগ নেত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ
- ছাত্রলীগ সভাপতির গোপন বিয়ের তথ্য
৮ সেপ্টেম্বর রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় এসব অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গুরুতর অভিযোগের পর তাদের আর দায়িত্বে রাখা যায় না।”
শনিবার রাতে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে সংগঠনে তাদের নিজ নিজ পদ থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর সংগঠনের সভাপতি হিসেবে সংগঠনটির ১ নং সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১ নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় শোভন ও গোলাম রাব্বানীর দুর্নীতি নিয়ে। ছাত্রলীগের আগাম সম্মেলনের দাবি ওঠে, কেউ কেউ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তনের দাবি জানান। শেষ পর্যন্ত সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির দুই শীর্ষ পদে পরিবর্তন আনা হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ জয়নুল আবেদিন রাসেল ফেসবুকে রাব্বানীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, নতুন ক্যাম্পাসের বালু ভরাট প্রকল্পে অর্থ দাবি করেছিলেন রাব্বানী। যদিও রাব্বানী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “কমিটি টিকিয়ে না রাখতে পারায় অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনে নিজের কক্ষে এসি লাগিয়ে রাব্বানী সমালোচনার মুখে পড়েন। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট সমাধানে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না নিয়ে ব্যক্তিগত আরামের জন্য এসি লাগানোয় সমালোচকরা ক্ষুব্ধ। রাব্বানী দাবি করেন, এক ‘শুভাকাঙ্ক্ষী’ তাকে উপহার হিসেবে এসি দিয়েছেন।
ছাত্রলীগের পদ পাওয়ার পর থেকেই শোভন ও রাব্বানী রাজধানীর অভিজাত এলাকায় উচ্চ ভাড়ার ফ্ল্যাটে বসবাস শুরু করেন। রাব্বানী টয়োটা কোম্পানির নোয়া মডেলের একটি মাইক্রোবাস ব্যবহার করতে শুরু করেন সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরদিন থেকেই।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ছাত্রলীগ নেতাদের সাদামাটা জীবনযাপনের নির্দেশ দিলেও শীর্ষ নেতাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে তিনি ক্ষুব্ধ। শনিবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তিনি বলেন, “আমিই তাদের নেতা বানিয়েছি। আর আমার ছাত্রলীগের এই নেতারাই অপকর্মে জড়িত হয়েছে। এটা মানা যায় না।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “শোভন ও রাব্বানী আমার সঙ্গে দেখা করে ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের জন্য চাপ দিয়েছিলেন।” তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও আচার্যকে তদন্তের অনুরোধ জানান।
অন্যদিকে, রাব্বানী পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, “ঠিকাদারের কাছে কমিশন চেয়েছি—এমন প্রমাণ থাকলে উপাচার্য তা তুলে ধরুক।”
রোববার তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও শোভন ও রাব্বানী ফোন ধরেননি।
শনিবার দিবাগত রাত একটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে মোটরসাইকেলে করে আসেন নতুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। উপস্থিত নেতাকর্মীরা ‘জয় ভাইয়ের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ বলে স্লোগান দেন। এ সময় শোভন বলেন, “অতিরঞ্জিত হয় এমন কিছু করবা না। যেটা আমাদের কষ্ট দেয়, শেখ হাসিনাকে কষ্ট দেয়।”



