শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া কি জায়েজ? ইসলাম কী বলে?

ক্যাপ্টেন(অবঃ)মারুফ রাজুঃ  শিশুদের নিষ্পাপ হাসি আর কোমল উপস্থিতি যে কারো মন ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয়। অবাধ্যতা কিংবা আনন্দের মুহূর্তে ওদের জড়িয়ে ধরা, কপালে চুমু দেওয়া মানব হৃদয়ের এক প্রাকৃতির ও নির্মল ভালোবাসার প্রকাশ। ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, এটি মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতির যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও শিশুদের অগাধ ভালোবাসতেন, তাদের বুকে জড়িয়ে ধরতেন এবং কপালে-গালে চুমু দিতেন। তবে এই নির্মল স্নেহের পাশাপাশি ইসলাম শিশুদের নিরাপত্তা, শালীনতা এবং শারীরিক সীমানা রক্ষার প্রতিও জোর তাগিদ দিয়েছে। কোমলমতি শিশুদের প্রতি সুন্নাহসম্মত ভালোবাসা ও তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে ইসলামের চমৎকার নির্দেশনাসমূহ জানা আমাদের সবার জন্য জরুরি।

 

শিশুদের চুমু দিতেন মহানবী (সা.)

শিশুদের প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা মহানবী (সা.)-এর জীবনাচরণের অন্যতম সুন্দর দিক। তিনি শিশুদের আদর করতেন এবং নিয়মিত চুমু দিতেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে—

 

قَبَّلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْحَسَنَ بْنَ عَلِيٍّ وَعِنْدَهُ الأَقْرَعُ بْنُ حَابِسٍ التَّمِيمِيُّ جَالِسًا، فَقَالَ الأَقْرَعُ: إِنَّ لِي عَشَرَةً مِنَ الْوَلَدِ مَا قَبَّلْتُ مِنْهُمْ أَحَدًا، فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ قَالَ: مَنْ لاَ يَرْحَمُ لاَ يُرْحَمُ

‘একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তার নাতি হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে চুমু দিলেন। সে সময় আকরা ইবনে হাবিস তামিমি নামের এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমার দশটি সন্তান রয়েছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু দিইনি।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না।’ (বুখারি ৫৯৯৭, মুসলিম ২৩১৮)

 

এই বিশুদ্ধ হাদিস থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায়, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে চুমু দেওয়া কেবল জায়েজই নয়, বরং এটি নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ ও অন্তরের দয়ার বহিঃপ্রকাশ।

কঠোরতা ও স্পর্শকাতরতাহীন আচরণকে নিরুৎসাহিত করেছেন নবীজি (সা.)

সন্তানকে জড়িয়ে ধরা ও স্নেহের চুমু দেওয়াকে যারা অপ্রয়োজনীয় মনে করে বা শিশুদের প্রতি কঠোরতা দেখায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের এই মনোভাবকে অপছন্দ করেছেন। আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত—

جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: تُقَبِّلُونَ الصِّبْيَانَ؟ فَمَا نُقَبِّلُهُمْ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَوَأَمْلِكُ لَكَ أَنْ نَزَعَ اللَّهُ مِنْ قَلْبِكَ الرَّحْمَةَ

‘একবার কয়েকজন বেদুইন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনারা কি শিশুদের চুমু দেন? আমরা তো সন্তানদের চুমু দিই না।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া-মমতা তুলে নিয়ে থাকেন, তবে তাতে আমার কী করার আছে?’ (বুখারি ৫৯৯৮, মুসলিম ২৩১৭)

 

এ থেকে স্পষ্ট হয়, সন্তান ও শিশুদের সাথে উষ্ণ ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই ইসলামি সংস্কৃতির মূলভিত্তি।

পবিত্র কুরআনে দয়া ও কোমলতার শিক্ষাঃ

যদিও পবিত্র কুরআনে শিশুদের চুমু দেওয়ার নির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে পৃথক আয়াত নেই, তবে সার্বিকভাবে কোমল আচরণ, দয়া ও মানুষের সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا

‘আর তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম ও সুন্দর ভাষায় কথা বলো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ৮৩)

অন্য আয়াতে স্নেহ ও বিনয় প্রকাশের নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন—

وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ

‘আর মুমিনদের প্রতি তোমার দয়ার ডানা অবনত কর (অর্থাৎ বিনয় ও অমায়িক আচরণ প্রদর্শন কর)।’ (সুরা আল-হিজর: আয়াত ৮৮)

কোমল আচরণ ও দয়ার এই সার্বিক নির্দেশনাই শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রকাশের মৌলিক ভিত্তি।

Share this post

scroll to top