জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতার কারনেই রাড্ডায় ভাংচুর এবং লুটপাট

ক্যাপ্টেন(অবঃ)মারুফ রাজুঃ  ঢাকার মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার-এর জমি দখল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে দেশ জুড়ে চলছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। ঘটনার পর জমির বরাদ্দ ও দখল নিয়ে উভয় পক্ষ থেকে এসেছে পালটাপালটি বক্তব্য। জমির মালিকানা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। তবে জমির মূল মালিক জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) বলছে—এই জমি কখনোই রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারকে  বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এই জমির লিজমূলে মালিক সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড। তবে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা বলছেন— জমির মালিকানা সমমনা সমবায় সমিতি হলেও তাদের দখল প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। কোনোভাবেই জবরদস্তি বা ভাঙচুর গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি আইনিভাবেই সমাধান করা যেত।

 

জানা যায়, ১৯৭৪ সাল থেকে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষকে মাতৃ ও শিশুসেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। এ সেন্টারের জায়গা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) নথি বলছে, মিরপুর সেকশন-১, ব্লক ‘ডি’, এভিনিউ-৪-এর দক্ষিণ পাশে ৬/১ নম্বর প্লটটির মালিক জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে ৯৯ বছরের জন্য এই জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। জাগৃকের নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৯ জুনে সমমনা সমবায় সমিতি লিমিটেডের সমবায় সমিতির পক্ষে সভাপতি মো. আশরাফ উদ্দিনের নামে লিজ দলিল সম্পন্ন হয়।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে স্বাস্থ্যসেবামূলক কাজ পরিচালনা করছে। তবে তারা কখনো জমির প্রকৃত মালিক জাগৃকের কাছে কোনো আবেদনই করেনি। এ বিষয়ে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার কীসের ভিত্তিতে জায়গাটি ব্যবহার করছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমরা ১৯৭৪ সাল থেকে এখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আমরা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিয়ে কাজ করছি। আমাদের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময় মেয়াদ বাড়িয়েছে। সবশেষ ১৯৮৩ সালে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করে আমাদের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ২০২১ সালে সমমনা সমবায় সমিতির সঙ্গে জাগৃকের লিজ দলিল সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি নিয়ে ঐ বছরেই রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট দায়ের করা হয়েছিল। রিটটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার আগেই জমিটি দখল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভাঙচুর করা হলো।

 

তবে জায়গাটি হাত ছাড়া হওয়ার শঙ্কায় আদালতে রিট করলেও জায়গার বৈধ মালিকানা নেওয়ার উদ্যোগ  গ্রহণ করেনি রাড্ডা কর্তৃপক্ষ। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষে কখনো আবেদনও করেনি বলে জাগৃক কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে। রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার এ রকম কোনো আবেদন করা হয়নি বলে গণমাধ্যমকে জানিয়ে বলেছেন, যেহেতু সরকারের আরেকটি মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়েই স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করছে এবং প্রতিষ্ঠানটি কোনো ব্যক্তির নামে নয়। তাই সরকারি জায়গা হলেও সেবামূলক কাজে হয়তো বাধা হবে না বলে তারা মনে করেছেন।

তবে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জমিটিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চললেও তাদের না জানিয়ে বা উচ্ছেদ না করে সেখানে কীভাবে আর একটি প্রতিষ্ঠানের নামে জমিটি বরাদ্দ দিল জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  এ বিষয়ে জাগৃকের বর্তমান কর্তৃপক্ষ দায় নিতে নারাজ। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, আমি এখানে দায়িত্বে আসার আগেই এই জমির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে। ফলে এর বেশি কিছু আমি বলতে পারবো না। তিনি জানান,  কাগজপত্র ঘেঁটে যেটা দেখেছি, এই জায়গা কখনোই রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারকে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এই জায়গার মূল মালিক হলো জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। এই জায়গা একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে সমমনা সমবায় সমিতিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০২১ সালে তাদেরকে লিজ দলিল রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। সে হিসেবে কাগজপত্র অনুযায়ী এই জায়গার বর্তমান মালিক সমমনা সমবায় সমিতি।

গত বৃহস্পতিবার রাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনার পর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের পক্ষ থেকে মিরপুর শাহআলী থানায় একটি এজাহার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

Share this post

scroll to top