ক্যাপ্টেন(অবঃ)মারুফ রাজুঃ কোনো আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পিএলসি থেকে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ৪৬ হাজার ১১৮ টাকা আত্মসাতের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ঋণ দেওয়ার বিষয়টি বোর্ডে উপস্থাপন করা হয়নি, নেওয়া হয়নি বোর্ডের অনুমোদনও। পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের এ ঘটনায় ১২টি মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
বৃহস্পতিবার দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজীর আহমেদ বলেন, উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট একটি লিজিং কোম্পানি। কোনো আবেদন বা জামানত ছাড়াই এবং বোর্ডে উপস্থাপন না করে ১১টি প্রতিষ্ঠান ও এক ব্যক্তির নামে প্রায় ৬৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা অসৎ উদ্দেশ্যে ও সুপরিকল্পিতভাবে প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। পরস্পর যোগসাজশ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এ ঘটনায় কমিশন ১২টি মামলা রুজুর অনুমোদন দিয়েছে।
তিনি বলেন, ১২টি মামলায় মোট আসামি ৫৪ জন। একই ব্যক্তিরা একাধিক মামলায় আসামি হওয়ায় প্রকৃত আসামি ২২ জন। এর মধ্যে ছয়জন বিভিন্ন মামলায় কমন আসামি।
দুদকের মানিলন্ডারিং অনুবিভাগের ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান শাখার নথিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
দুদক জানায়, ১১টি প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া ঋণের মাধ্যমে ৫৫ কোটি ৭১ লাখ ৯২ হাজার ৯২৮ টাকা এবং উত্তরা ফাইন্যান্সের সাবেক সিনিয়র অফিসার মিঠু কুমার সাহার ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করা ১৩ কোটি ৮ লাখ ৫৩ হাজার ১৯০ টাকাসহ মোট ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ৪৬ হাজার ১১৮ টাকা আত্মসাতের তথ্য রয়েছে।
দুদক আরও জানায়, ম্যাক্স সোরেটার বিডি লিমিটেডের নামে ৬ কোটি, সাদ মুসা ফেব্রিক্স লিমিটেডের নামে ৪ কোটি, সাজিদ মাহমুদ কটন মিলস লিমিটেডের নামে ৪ কোটি এবং জেসন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের নামে ৪ কোটি ৮৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৮৬ টাকা আত্মসাতের তথ্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি অর্থের ঘটনা বেইজ টেক্সটাইল লিমিটেডে। প্রতিষ্ঠানটির নামে ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার ১১৯ টাকা আত্মসাতের তথ্য নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ মামলায় আসামি তিনজন।
এছাড়া প্যান এশিয়া ট্রেড হাউসের নামে ১ কোটি ২৩ লাখ ৪৩ হাজার ৯০১ টাকা, ডাইনামিক স্টক ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের নামে ১ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার ৩০৬ টাকা, শাহ মো. সগীর অ্যান্ড কোংয়ের নামে ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৩২২ টাকা, এসটিসি শিপিং লাইন্স লিমিটেডের নামে ৬০ লাখ টাকা, জাগো আর্ট সেন্টার ও মেসার্স ইন্টারন্যাশনালের নামে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং রকিবুল আনোয়ার হাসপাতাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ঢাকা লিমিটেডের নামে ১ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য রয়েছে।
দুদকের নথিতে প্রকৃত আসামি হিসেবে ১৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা রয়েছেন। তারা হলেন- ম্যাক্স সোরেটার বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মনিরুজ্জামান, পরিচালক সেলিনা জামান, কাজী সিরাজুজ্জামান ও কাজী আবুল কালাম আজাদ; সাদ মুসা ফেব্রিক্স ও সাজিদ মাহমুদ কটন মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহসিন এবং পরিচালক মোসাম্মত রোকেয়া বেগম ও শামীমা নার্গিস।
এছাড়া জেসন ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালক আযরা সেলিম, জিনাত সেলিম, এনাম মালিক ও নাফিজা সেলিম, বেইজ টেক্সটাইলের ভাইস চেয়ারম্যান মনোয়ার শাহাদাত ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান শিবলী, প্যান এশিয়া ট্রেড হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফাইজুল হক এবং রকিবুল আনোয়ার হাসপাতাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রকিবুল মোহাম্মদ আনোয়ার ও তার স্ত্রী নাফিজা আক্তার আনোয়ার রয়েছেন।
এর সঙ্গে উত্তরা ফাইন্যান্সের সাবেক ছয় কর্মকর্তাকে কমন আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন- সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম শামসুল আরেফীন, সাবেক সিনিয়র অফিসার মিঠু কুমার সাহা, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব ট্রেজারি মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী আরিফুজ্জামান, সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম কামরুজ্জামান এবং সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার রাকিবুল ইসলাম।
দুদক জানায়, দুদকের নথিতে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা করার কথা বলা হয়েছে।
নথির বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো আবেদন বা প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র জমা না দিয়ে, জামানত ছাড়াই এবং বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে ঋণ দেওয়া হয়। পরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে এসব অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

