ক্যাপ্টেন(অবঃ) মারুফ রাজুঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তিন লাখ পীর এলাকায় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির সদস্য ও ভূঞা গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কবীর আহমেদ ভূঞার আবেদনের প্রেক্ষিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ২৯ মার্চ বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা)-এর নির্বাহী পরিচালক (বিনিয়োগ) স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে ২৪ ও ২৬ মার্চ কুমিল্লা–সিলেট মহাসড়কের তিন লাখ পীর এলাকাকে ইপিজেড হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আবেদন করেন কবীর আহমেদ ভূঞা।
কৌশলগত অবস্থানেই বাড়তি গুরুত্ব
প্রস্তাবিত এই এলাকা কুমিল্লা–সিলেট মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট—দেশের তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক করিডোরকে সংযুক্ত করেছে। পাশাপাশি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের নিকটবর্তী হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এটি একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অবস্থানগত দিক থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা, ঢাকা তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা এবং সিলেট প্রায় তিন ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। এছাড়া ভারতের আগরতলা শহরে সড়কপথে পৌঁছানো যায় প্রায় এক ঘণ্টায়। এমন সংযোগ ব্যবস্থা রপ্তানিমুখী শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবকাঠামো ও জ্বালানিতে শক্তিশালী ভিত্তি
প্রস্তাবিত এলাকার আশপাশে ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। আশুগঞ্জ নদীবন্দর আমদানি-রপ্তানির একটি দ্রুততম রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আখাউড়া রেলওয়ে জংশন দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের অন্যতম উৎস। তিতাস গ্যাসক্ষেত্র দেশের বৃহৎ গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্রগুলোর একটি, যা জাতীয় চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করে। কসবা অঞ্চলের সালদা, কাশীরামপুর ও তারাপুর গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে।
গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও পরিবহন সুবিধার সমন্বিত উপস্থিতি এ অঞ্চলকে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পাঞ্চলে পরিণত করেছে।
জমি ও স্থানীয় জনগণের ইতিবাচক মনোভাব
এলাকাজুড়ে বিস্তীর্ণ খালি জমি রয়েছে, যার একটি বড় অংশ সরকারি খাস জমি। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ শিল্পায়নকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত থাকায় জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াও তুলনামূলক সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ ইপিজেড স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ইতোমধ্যেই বিদ্যমান।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী একাধিক বিদেশি বিনিয়োগকারী ইতোমধ্যেই এ অঞ্চলকে সম্ভাব্য ইপিজেড হিসেবে বিবেচনা করছেন। কম খরচে জমি, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সীমান্তবর্তী অবস্থান—সব মিলিয়ে এটি রপ্তানিমুখী শিল্প বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
মডেল ইপিজেড গড়ার সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে কুমিল্লা–সিলেট মহাসড়কের এই অঞ্চলটি দেশের একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মডেল ইপিজেড হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এটি শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয়, বরং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বাণিজ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কবীর আহমেদ ভূঞার বক্তব্য
এ বিষয়ে কবীর আহমেদ ভূঞা বলেন, “কুমিল্লা–সিলেট মহাসড়কের তিন লাখ পীর এলাকা বাংলাদেশের নতুন মডেল ইপিজেড গড়ার জন্য একটি সুপার-স্ট্র্যাটেজিক স্থান। ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে এটি দ্রুত দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছি। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ ক্রমেই একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। এখানে বিনিয়োগ করলে কার্যত অর্ধেক বিশ্বের বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সেই সম্ভাবনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।”
তিনি আরও বলেন, আমি এ অঞ্চলে ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি আসবে।



