একটি বৈঠক ও জনপ্রত্যাশা

ক্যাপ্টেন (অবঃ) মারুফ রাজুঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের শুরু হতে যাচ্ছে ১৩ জুন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশনায়ক তারেক রহমানের সাথে  লন্ডন সময় সকাল ৯ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত বৈঠক হবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের। 

তারেক রহমান বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় প্রধান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ হওয়ার পর উনার নেতৃত্বেই দলটি সুসংহত রয়েছে ও জনভিত্তি ধরে রেখেছে। তারেক রহমান একজন বিচক্ষণ এবং সুবিবেচনাপ্রসূত নেতা। উনার প্রজ্ঞা ও সুদৃঢ় নেতৃত্বের স্বাক্ষর আজ সর্বজনবিদিত।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী। তিনি সমাজে এবং দেশে-বিদেশে সবার কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলেই সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে উনাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নিয়েছে।

আজ দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ১৩ ই জুন  তাদের মিলিত হওয়ার দিনটি একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের কোন সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এখন পর্যন্ত দিতে পারেনি। নির্বাচনের যে সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার তা নিয়ে স্পষ্টতই বিএনপি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দ্বিমত আছে। জনমনেও এটা চরম আশঙ্কার কারণ, এত তীব্র গরমে এবং রোযার সময় প্রচারণা চালিয়ে( যা বাংলাদেশের ইতিহাসে হবে প্রথম) কীভাবে একটি জাতীয় নির্বাচন করা সম্ভব? যেই নির্বাচনটি বহুল আকাঙ্ক্ষিত! অন্তত ১৭ বছর পর মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে। 

ফ্যাসিস্ট আওয়ামি লীগ দ্বারা সবচেয়ে নির্যাতিত দল বিএনপি। হত্যা, গুম, ব্যাবসা বাণিজ্য ধ্বংস, চাকরি হারানো, দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে মিথ্যা মামলা দিয়ে  দিনের পর দিন জেলে রাখা এবং এই দলটাকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রিত আদালতে সাজা দিয়ে ২০১৮ সাল থেকে জেলে রাখা, তাকে পরিকল্পিতভাবে অসুস্থ করে ফেলা,  দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়া, ভুয়া নির্বাচনগুলোতে কিংস পার্টি গঠন করে দল থেকে নেতাদেরকে ভাগিয়ে নেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা; কি না করা হয়েছে জনগণের প্রাণের দল বিএনপি কে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য!! তাই এখন যখন বিচার নিয়ে কেও কেও বা কোন দল এই সন্দেহ করে যে, বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসলে ফ্যাসিস্টদের বিচারের অগ্রগতি থেমে যাবে, তখন তারা হয়ত ভুলে যান নিপীড়িত বিএনপির কথা, তারা ভুলে যান বিএনপি এই হত্যা, গুম, খুন এবং জুলাই ম্যাসাকারের বিচারের কথা সর্বপ্রথম বলেছে এবং এ বিচার সবচেয়ে সুষ্ঠুভাবে করা এবং এর রায় কার্যকর করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। 

বিএনপি ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই  রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ৩১ দফা জাতির সামনে হাজির করে। এত সুচিন্তিত ও বিস্তৃত এবং সমাজের সব শ্রেণি পেশার মানুষের সুষম উন্নয়ন ও অধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা বিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সাথে দিনের পর দিন আলোচনা করে এই রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ৩১ দফা তৈরি করা হয়। আজকে যতগুলো কমিশন গঠিত হয়েছে এর সিংহভাগ কমিশনের কথা বিএনপির এই ৩১ দফাতে( দফ ১০, ১১, ১২,১৩) উল্লেখ করা আছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের অপশাসন থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য যে একটি নতুন পথনির্দেশনা দরকার তা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, আর উনার নেতৃত্বেই এবং উনার ঐকান্তিক চেষ্টায় এই ৩১ দফা প্রণয়ন করা হয়। ৩১ দফার আলোকেই বিএনপি এই জাতিকে একটি নতুন আলোকবর্তিকার সন্ধান দিয়েছে। সুতরাং এখন যে একটা প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে,  বিএনপি সংস্কার চায় না,শুধু নির্বাচন চায়; এর চেয়ে ডাহা মিথ্যা কথা আর কিছু হতে পারে না।

গত ১৭ বছর ধরে বিএনপি একটি গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করে আসছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার আদালতকে কুক্ষিগত করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৩০ জুন, ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে এবং দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের সব পথ বন্ধ করে দেয়। বিএনপি গত ১৭ বছর ধরেই বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার সাথে সাথেই এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং এই ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার জন্য প্রতিনিয়ত আন্দোলন করে। দেশের মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য বিএনপির এই সংগ্রামে অগণিত মানুষ প্রাণ দিয়েছে, গুম হয়েছে, বিএনপি দল হিসেবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও নানান ধরনের প্ররোচনার পরও বিএনপি সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি থেকে এক ধাপও পিছিয়ে আসেনি। এখন অনেকেই যখন বলেন, বিএনপি শুধু নির্বাচন-নির্বাচন করে; তারা কি এটা দেখে না যে এই রাজনৈতিক দলটি গণমানুষের অধিকারের জন্য বছরের পর বছর ধরে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলছে ও সক্রিয় আন্দোলন করছে।

২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার পর মূলত কোন দেশের সরকার প্রধানের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন নি। ১৩ ই জুন হতে যাচ্ছে সেই দিন। দেশের আপামর জনসাধারণ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী,  সাংবাদিক সবার দৃষ্টি এখন ১৩ জুন। 

কী আলোচনা হবে? আলোচনা ফলপ্রসূ হবে কি না? নির্বাচনের তারিখের কোন পরিবর্তন হবে কি না? সংস্কার, জুলাই সনদ, বিচারের কি হবে?

তারেক রহমান একজন বিচক্ষণ এবং সংবেদনশীল মানুষ। আমরা আশা করি প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এবং তারেক রহমানের বৈঠকে উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো নিয়ে সুবিস্তৃত আলোচনা হবে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস নিশ্চয়ই জানেন এবং বুঝেন, বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং জনপ্রতিনিধিত্বশীল দল। তাই উনি নিশ্চয়ই বিএনপিকে সবচেয়ে নির্ভরশীল মনে করবেন সংস্কার ও বিচারের ব্যাপারে। আর নির্বাচন বিষয়েও একটি আস্থাশীল জায়গায় আসবেন, যেন প্রকৃতই মানুষ নির্বিঘ্নে এবং একটি অনুকূল পরিবেশে ভোট দিতে পারে। আশা করি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তার ক্যারিশম্যাটিক গুণাবলির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে বুঝাতে সক্ষম হবেন, কেন নির্বাচনের কোন বিকল্প নেই, সংস্কারের চলমান প্রক্রিয়া, নির্যাতিত-নিপীড়িত দল হিসেবে বিএনপিই যে সর্বাগ্রে বিচার চায়, জুলাই সনদের আদ্যোপান্ত এবং আরও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা।

বাংলাদেশের গণমানুষ একটি সুষ্ঠু  জাতীয় নির্বাচনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছে। একটি দেশকে বিশ্ব-দরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে ঐ দেশের সুশৃঙ্খল ও সুশিক্ষিত মানুষ। আর এই মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য দরকার, সত্যিকারভাবে নির্বাচিত সরকার যাদের সব ধরনের ম্যান্ডেট থাকে এবং একই সাথে জবাবদিহিতা থাকে জনগণের প্রতি।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তার নিজের প্রজ্ঞা  দিয়ে নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবেন এবং নির্মোহভাবে একটি ফলপ্রসূ আলোচনা করবেন এই হচ্ছে জনপ্রত্যাশা।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক বৈঠকের ফলাফল নিয়ে মানুষ সব সময় শঙ্কিত থাকলেও ১৩ জুনের  তারেক রহমান ও মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠক নিয়ে চরম প্রত্যাশা। দুইজন দূরদর্শী পরীক্ষিত মানুষ জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে একটি আশাপ্রদ, যুগান্তকারী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হাজির করবেন এই হোক সবার কামনা।

Share this post

scroll to top