DMCA.com Protection Status
ADS

১/১১ এর হোতা জেনারেল মঈনের অপতৎপরতার অজানা কাহিনী

দৈনিক প্রথম বাংলাদেশ প্রতিবেদনঃ বিশ্বাসঘাতকতা,শঠতা এবং প্রাসাদ ষঢ়যন্ত্রে সাবেক সেনা প্রধান মঈন ইউ আহমেদ এর জুড়ি মেলা ভার।  ১১ ই জানুয়ারী ২০০৭ এর পূর্বেও সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল মইন আরো অন্ততঃ ৩ বার চেষ্টা করেছেন জরুরী অবস্থা জারীর। কিন্তু নানা কারণে তার সে প্রয়াস বার বার ব্যর্থ হয়। সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেবার পর থেকেই তার কুনজর পড়ে মসনদের দিকে। সে লক্ষ্যে তার প্রস্তুতি চলতেও থাকে।

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর যার পরিচিত নাম ডিজিএফআই, এর কতিপয় উচ্চাভিলাশী কর্মকর্তা মইনের অভিলাস পূরণের লক্ষ্যে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে থাকে গোপনে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কাজ বাদ দিয়ে সামরিক শাসন জারীর জন্য প্রেক্ষাপট তৈরীর কাজ শুরু করে এরা। এসব কর্মকর্তারা মইনের পরিকল্পনা মাফিক বিভিন্ন রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহ, উপাত্ত তৈরী করা, মন্ত্রী-এমপি-রাজনীতিক-ব্যবসায়ী-আমলাদের তালিকা তৈরীকরন, ফোন নম্বর, ঠিকানা, ছবি সংগ্রহ করে প্রোফাইল তৈরী করেন। টেলিফোনে আড়ি পেতে তাদের ব্যবসায়িক ও গোপণীয় খবর সংগ্রহ করে আমলনামা তৈরী করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্থাপিত এসএসএফ কার্যালয়ে বিভিন্ন ভিআইপি ও বিশিষ্টজনদের ঠিকানা, ফোন নম্বর ও ছবি সংরক্ষিত থাকে।

তৎকালীন এসএসএফ ডিজি মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমী (বিএনপির তৎকালীন এমপি মেহেদী আহমেদ রুমীর ছোট ভাই) এ সকল টেলিফোন নম্বর ও ছবি সরবরাহ করেন ডিজিএফআইকে। এই ফাতেমী আহমেদ রুমীর পিতা বিএনপি-র প্রয়াত এমপি মাছ-উদ রুমীর নামে খোকসা সেতুর নামকরন করে খালেদা জিয়া ঐ এলাকায় ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন। কিন্তু এর জবাবে ফাতেমী রুমী ১/১১-র ঘটনায় মইনকে সহযোগিতা করে খালেদা জিয়ার নিকট পিতা-পুত্রের ঋণ শোধ করেন।

জেনারেল মইনের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা যে সুদূরপ্রসারী ছিল তা লক্ষ্য করা যায় তার ও গোয়েন্দা সংস্থার মূখপাত্র হিসাবে পরিচিত দৈনিক আমাদের সময়ে প্রকাশিত গোয়েন্দা সূত্রের বরাতের সংবাদে। “বিদেশে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন মন্ত্রী এমপি আমলাসহ সহস্রাধিক ব্যক্তি” শিরোনামে ৩রা অক্টোবর ২০০৬ আজাহার আলী সরকার পরিবেশিত খবর ছাপে, “প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা এবং দলীয় ক্যাডারসহ চারদলীয় জোটের কমপক্ষে এক হাজারেরও বেশি নেতাকর্মী বিদেশে পালানোর প্রস্তু'তি নিচ্ছেন। সরকারের মেয়াদপূর্তির ১৭ থেকে ১৮ দিন আগে থেকেই এসব নেতাকর্মীরা ওমরাহ পালন, উন্নত চিকিৎসা, ব্যবসা, বিদেশে অবস্থানরত নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎসহ বিভিন্ন অজুহাতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দেশ ছাড়তে পারেন বলে শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগাম আভাস দিয়েছে।” অর্থাৎ ডিজিএফআই তালিকা তৈরী করেছে কাকে ধরা হবে সরকার পরিবর্তন হলে। এ নির্দেশ কে দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাকে। সরকারের ২৬ দিন বাকী থাকতে নিশ্চয়ই খালেদা জিয়া এ নির্দেশ দেননি। আসলে মইন অনেক আগে থেকেই ডিজিএফআইকে নিয়ন্ত্রণে রেখে নানান অপতৎপরতা শুরু করেছিলেন।

২৮শে অক্টোবর পল্টনে লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যার পর জরুরী আইন জারীর প্রথম উদ্যোগ নেন মইন। মঈনের ঘনিষ্ট কতিপয় মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে প্রায় রাজী করিয়ে ফেলেন- রাস্তাঘাট, আইন-শৃঙ্খলা চালু রাখতে জরুরী অবস্থা জারী করার জন্য। অধ্যাদেশ-বিধি সব তৈরী করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অপেক্ষায় প্রস্তুত থাকে। কিন্তু ইয়াজউদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেয়ায় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহনের ফলে রাজপথ থেকে মহাজোট কর্মী প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে সে যাত্রা জরুরী অবস্থা জারীর হাত থেকে দেশ রক্ষা পায়। যেভাবেই হোক, মঈনের পাতা ফাঁদে পা দেয়নি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি।

মঈন জরুরী অবস্থা জারীর ২য় চেষ্টা করেন ২০০৬ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি। তখনও আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন জোট প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আজিজের পদত্যাগের দাবীতে সোচ্চার। তবে প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে ইয়াজউদ্দিনকে মেনে নিয়ে তার সঙ্গে দেন-দরবার চালিয়ে যাচ্ছিল।

২০০৬ এর মধ্য নভেম্বরে মইন দেখা করেন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের সাথে। ঐ সময় মইন ইয়াজউদ্দিনকে জরুরী অবস্থা ঘোষণার জন্য চাপ দেন একথা বলে যে, খালেদা জিয়া রাজী আছেন। জরুরী অবস্থা জারী করা হলে আওয়ামীলীগের আন্দোলন যেমন দমানো যাবে, তেমনি নির্বাচন করাও সম্ভব হবে। কিন্তু সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয় খালেদা জিয়ার কিছু কাছের লোকের বিরোধিতার কারনে। মইন তার এ সব তৎপরতার কথা ভিন্নভাবে লিখেছেন তার বইতে, “দেশের পরিস্থিতি আমাকে কষ্ট দিলেও কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে আমরা বিরত থেকেছি। তারপরও মনের তাগিদেই আমি প্রেসিডেন্টকে বার বার অনুরোধ করেছি, দেশের জন্য ভালো কিছু করার, দেশকে বাঁচানোর চেষ্টা করার জন্য। তিনি মনোযোগ সহকারে আমার কথা শুনতেন, কোনো মন্তব্য করতেন না।”

২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা করা হলে নানা দেন-দরবারের পরে সকল দল ও জোট নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিল করে ২৬ ডিসেম্বর। সমগ্র জাতি নির্বাচনে মেতে ওঠে। এতে করে মইন প্রমাদ গুনেন। এমনতো হওয়ার কথা ছিল না। পরিস্থিতি মোকাবেলায় খুব দ্রুততার সাথে আওয়ামীলীগের RATS গ্রুপের (রাজ্জাক-আমু-তোফায়েল-সুরঞ্জিত) যোগাযোগ করেন ভারতীয় দূতাবাসের মধ্যস্ততায়। সিদ্ধান্তমত  RATS এর পক্ষ থেকে আওয়ামীলীগের ৯ জন প্রেসিডিয়াম সদস্যের স্বাক্ষরে পত্র যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে- যাতে হাসিনাকে নির্বাচন থেকে ফেরানো হয়। প্রণব মুখার্জীর ফোন পেয়ে ৩ জানুয়ারী ২০০৭ শেখ হাসিনা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন- যুক্তিসঙ্গত কোন কারন ছাড়াই।

কেননা, যে প্রেক্ষাপটে পরে ২০০৮ এর শেষে মহাজোট নির্বাচনে অংশ নেয় তখন পর্যন্ত তার কোন পরিবর্তন হয়নি। আজও সে ঘটনা রহস্যাবৃত- কেন শেখ হাসিনা হঠাৎ করে নির্বাচন থেকে সরে দাড়িয়েছিলেন। আসলে ভেতরে ভেতরে বাংলাদেশ ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিলেন মঈন-বিউটেনিস-আনোয়ার চৌধুরী গংরা।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা মোখলেস চৌধুরী তখন বিভিন্ন বিষয় মীমাংসা করার জন্য দুই নেত্রীর কাছে দূতিয়ালীতে ব্যস্ত। তিনি রাষ্ট্রপতির খুব বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। মইন ব্রিগেডিয়ার বারীকে পাঠান মোখলেস চৌধুরীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে জরুরী আইন জারীর বিষয় রাজী করাতে। নানা টোপ দেয়া হয় তাকে, এমনকি ওজারতির লোভও। কিন্ত কোন কাজ হয়নি তাতে- সে যাত্রাও ফল আসেনি মঈনের। এর পরে চরমে ওঠে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।

পর পর ৩ বার ব্যর্থ হয়ে মঈন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সকল শক্তিকে কাজে লাগান- নির্বাচন বর্জন, অরাজকতা, হানাহানি ও সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপট তৈরীর কাজে। মহাজোট আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করে। এক পর্যায়ে আওয়ামীলীগের পল্টন ময়দানের কর্মসূচীতে জাতীয় নেতৃবৃন্দকে পুলিশ লাঠিপেটা করে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের পরামর্শ অনুয়ায়ী।

 

৫ থেকে ১০ জানুয়ারী বাংলাদেশের ঘটনাবলীর খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ৫ জানুয়ারী মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস সকল কূটনৈতিক শিষ্টাচার লংঘন করে সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পি.এস.ও. মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীরের সাথে দেখা করেন।

পরে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরী সেনা প্রধানের সাথে বাকী কার্যক্রম চুড়ান্ত করেন। হাবিব ভিলাতে আয়োজিত মঈন-বিউটেনিস বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। জেনারেল মঈন সামরিক শাসন জারী করে রাষ্ট্রপতি হতে চাইলেও বিউটেনিস রাজী না থাকায় জরুরী অবস্থা নিয়েই খুশী থাকতে হয় মইনকে।

মঈনের নির্দেশমত পি.এস.ও. মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশী স্থায়ী প্রতিনিধি ইফতেখার চৌধুরীর মাধ্যমে জাতিসংঘের মহাসচিব হতে বাংলাদেশ সংক্রান্তে একটি উদ্বেগজনক পত্র আনেন যাতে লেখা ছিল, ““The United Nations is deeply concerned by the deteriorating situation in the country, and urges all parties to refrain from the use of violence. It is hoped that the army will continue to play a neutral role, and that those responsible for enforcing the law act with restraint and respect for human rights.” এর প্রতিদানে ইফতেখারকে পরবর্তীতে ফখরউদ্দিনের সরকারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বানিয়ে পুরস্কৃত করা হয়, যদিও তিনি চেয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা হতে।

কিন্তু এ পত্রের দ্বারা মইন সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকদের রাষ্ট্রদ্রোহী কাজে রাজী করাতে ব্যর্থ হন। এরপরে তিনি দ্বারস্থ হন জাতিসংঘের ঢাকাস্থ প্রতিনিধি রেনাটা লক ডেসালিয়নের। রেনাটা জাতিসংঘ মহাসচিবের নির্দেশনা ছাড়াই ঢাকা হতে নিজ দায়িত্বে ষ্টেটমেন্টে একটি নতুন লাইন যোগ করে দেন, "However, should the 22 January parliamentary elections proceed without participation of all major political parties, deployment of the armed forces in support of the election process raises questions. This may have implications for Bangladesh's future role in peacekeeping operations," she added. অর্থাৎ প্রধান প্রধান দলের অংশগ্রহণ ছাড়া ২২শে জানুয়ারীর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে সেনাবাহিনী সমর্থন করলে তাদের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে নিয়োগ সমস্যায় পড়বে। সেনাপ্রধান মঈন এ অস্ত্র ব্যবহার করে সৈন্যদের উত্তেজিত করে তোলেন।

এদিকে মইনের পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক নবম পদাতিক ডিভিশনের জি.ও.সি. মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (যিনি বেগম জিয়ার ছোট ভাই সাইদ ইস্কান্দারের ভায়রা ভাই) সাভার সেনানিবাস হতে শত শত সৈন্য, ট্যাংক সহ ভারী অস্ত্র নিয়ে হাজির হন বঙ্গভবনে। ৪৬ ব্রিগেডের সৈনিক ও অফিসারদেরও আনা হয়। ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজি ব্রিগেডিয়ার বারী আগে থেকেই বঙ্গভবনে উপস্থিত থেকে সকল আয়োজন সমন্বয় করেন। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আমিরুল করিম বিনা রক্তপাতে মইনের নেতৃত্বে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত শত শত সৈনিক ও অফিসার প্রবেশ করান বঙ্গভবনের মধ্যে। বঙ্গভবনের ভেতরে ও বাইরে এ সময় যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। এমনকি রাষ্ট্রপতির বেডরুমের বাইরেও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে সেনা কর্মকর্তা দন্ডায়মান ছিল। এ প্রসঙ্গে মঈনের বইয়ে লেখা নিজের উক্তি, “আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছিলো না, আমি যা করতে যাচ্ছি তাতে ভয়ঙ্কর ঝুঁকি বিদ্যমান। কিন্তু দেশ ও সেনাবাহিনীর প্রশ্নে আমি সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত হয়ে উঠলাম।”—-“কিন্তু আমি তখন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, পরিস্থিতি যাই হোক, যতো ঝুঁকিপূর্ণ হোক, আমি আমার চেষ্টা করবো।”

রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী এস.এস.এফ. প্রধান ফাতেমী রুমীর সম্মতিতে রাষ্ট্রপতির জীবন রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সিপিজি কমান্ডার লে.কর্নেল শফি তিনটি পিস্তল তুলে দেন মইন সহ ৩ বাহিনী প্রধানের হাতে, যা নিয়ে তারা রাষ্ট্রপতির কক্ষে প্রবেশ করেন। রাষ্ট্রপতিকে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগ পত্রে সই করতে বাধ্য করা হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতি তাঁর স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চাইলেও মঈন সে অনুমতি দেননি। কেননা মইন জানেন ৩ বার তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এবার ব্যর্থ হলে নির্ঘাত মৃত্যু। মইনের জবানীতে, “পিজিআর ও এসএসএফ সদস্যদের টানটান উত্তেজনা। সব যেন কেমন থমথমে। মনে হলো এ যেন বিধ্বংসী এক ঝড়ের পূর্ব মুহূর্ত।”—–“দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে মহামান্য প্রেসিডেন্ট আরো কিছুটা সময় চাইলেন। আমি স্পষ্ট অনুভব করছিলাম রাষ্ট্রপতি পরিস্থিতির গুরুত্ব ঠিকই অনুধাবন করতে পারছেন। তবে এতোবড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে তিনি কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত, এজন্যই সময় নিতে চাচ্ছেন। আমি জানতাম ইতোপূর্বে উপদেষ্টা পরিষদের অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত অজানা কোনো কারণ ও প্রভাবে পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। যার কারণে আমরা কোনো দুষ্টচক্রকে আবার নতুন কোনো খেলা শুরু করার সুযোগ দিতে চাচ্ছিলাম না।”

এভাবে এক বয়োবৃদ্ধ রাষ্ট্রপতিকে অস্ত্রের মুখে জোর করে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করিয়ে জরুরী অবস্থা জারী করে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করে দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসেন মইন। নিজে রাষ্ট্রপতি হবার উদগ্র বাসনায় ২ বছরব্যাপী অসাংবিধানিক শাসন, অত্যাচার-নির্যাতন, দুর্নীতি-লুটপাট, বিরাজনীতিকরন, মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের সকল চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি। কেননা তার সারা জীবন ছিল মিথ্যা আর ষড়যন্ত্রে ভরা। মহান আল্লাহতায়লা তার মনোবাসনা পূরন করেননি।

২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ দিনের ভারত সফরে গিয়ে মইন দিল্লির অনুকম্পা নিয়ে দেশের পূর্ন ক্ষমতায় বসার চেষ্টা করেন। কিন্তু দিল্লি তাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে দিতে রাজী হয়নি। বরং ভারত তাকে ৬ ঘোড়া দিয়ে খুশি থাকতে বলে। তার পরিবর্তে মঈনকে নির্দেশ করে তাদের পছন্দের (সেক্যুলার ফোর্স) শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে কুশীলবদের নিয়ে সেইট এগ্জিট নিতে। এরপরে ২৯ ডিসেম্বর আয়োজিত কন্ট্রেলড নির্বাচনে পূর্বে তৈরী করা ফলাফলের ভিত্তিতে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসায় মইন। এর দ্বারা ভারতের হাতে চলে যায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব- অর্থাৎ দিল্লির রাডারের তলায় বাংলাদেশ।

শেখ হাসিনা ক্ষমতা নেয়ার পরে মাস ছ’য়েক সেনাপ্রধানের কাজ করার পরে জুুন’২০০৯ মাসে অবসরে যান মঈন, তবে শেখ হাসিনা তাকে আর কোনো নতুন দায়িত্ব দেননি। এর মাঝখানে ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ঘটে যায় পিলখানায় ৫৭ সেনা অফিসার হত্যাকান্ড, বিডিআর গনহত্যা , যাতে সেনাপ্রধান মঈন নিজে জড়িত থাকায় হতভাগ্য সেনাঅফিসারদের উদ্ধারে তৎপর হননি।

অবসরের কিছুদিন পরে মইনের বিচার চেয়ে দাবী ওেঠে চারদিকে। কিন্তু ভারত-আমেরিকা সহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রদূতদের মধ্যস্ততায় মঈন রাতের আঁধারে রানওয়ের ভেতর দিয়ে বিমানে উঠেন। দেশ থেকে পালিয়ে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বসিত জীবন। ছড়ানো হয় ক্যান্সার কাহিনী কুকুরের কামড় খাওয়ার গল্প। তবে দেশের মানুষ মনে করে মঈনের প্রায়শ্চিত্য এখনও বাকী। রাষ্ট্রদ্রোহী মঈনের জন্য এখনও অপেক্ষা করছে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার মর্মান্তিক পরিণতি।

Share this post

scroll to top
error: Content is protected !!