DMCA.com Protection Status
ADS

ঘুর্নিঝড় রোয়ানুর ছোবলে উপকূলের ৫ জেলায় ২৩ জনের প্রাণহানি

roanu copy

ক্যাপ্টেন(অবঃ)মারুফ রাজুঃ  গতিপথ পরিবর্তন করে মিয়ানমার ও আসামের দিকে চলে গেছে মূল ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু। তবে বাংলাদেশ উপকুলে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর হালকা আঘাতে এ পর্যন্ত শিশুসহ নিহত ১১ জন নিহত হওয়ার খবর জানা গেছে। এই আঘাতে চট্টগ্রাম, ভোলা ও পটুয়াখালীতে ১১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি।

এই ঘূর্ণিঝড় নিয়ে আবহাওয়ার বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় 'রোয়ানু' বাংলাদেশে উপকূলের দিকে আরও এগিয়ে এসেছে। শনিবার বিকেলের মধ্যেই এটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও বরিশাল উপকূল অতিক্রম করছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, শনিবার দুপুরের দিকে ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম, ভোলা ও বরিশাল অতিক্রম করছে। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু মূলত শুক্রবার মাঝরাতে উপকূলে আঘাত হানে। এর প্রভাবে তখন থেকে উপকূল অঞ্চলসহ সারা দেশে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আর এই বৃষ্টিই ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

আজ দুপুরে ভোলায় আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় 'রোয়ানু'। ঝড়ে ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলায় ঘরচাপায় নারীসহ দু'জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক লোকজন। এছাড়া ঝড়ে উপজেলার বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি ও দোকানপাট বিধ্বস্ত হয়েছে।

এ ছাড়া লালমোহন উপজেলায় ঝড় আতঙ্কে আরও একজন মারা গেছেন। ঝড়ে দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- তজুমদ্দিন উপজেলার শশীগঞ্জ গ্রামের মফিজের ছেলে মো. আকরাম (১২), একই এলাকার মো. নয়নের স্ত্রী রেখা বেগম (২৫), লালমোহন উপজেলার বাংলাবাজার এলাকার মো. ইউনুস (৫৫)। আহতদের উদ্ধার করে তজুমদ্দিন ও ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঝড়ে ভোলার দৌলতখানে রানু বিবি (৫০) নামে আরো এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।

আজ বিকেল ৩টার দিকে দমকা হাওয়ার কারণে ঘরচাপা পড়ে তিনি মারা যান। মৃত রানু বিবি উপজেলার দক্ষিণ জয়নগর ইউনিয়নের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী। পটুয়াখালীর দশমিনায় ঘূর্ণিঝড়ে শনিবার সকালে নয়া বিবি (৫২) নামে এক গৃহবধূ ঘুমন্ত অবস্থায় ঘরচাপায় নিহত হয়েছেন। তিনি উপজেলার উত্তর লক্ষ্মীপুর গ্রামের সুন্দর আলীর স্ত্রী। জেলার রাঙ্গাবালী ও গলাচিপা উপজেলায় বেশকিছু কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঞ্জল সলিমপুরে গাছচাপায় শনিবার ভোররাতে মা কাজল বেগম (৫০) ও তার ছেলে মো. বাবু (১০) নিহত হয়েছেন। নিহতরা ওই এলাকার মো. রাফিকের স্ত্রী ও ছেলে। এদিকে, টিনের চাল উড়ে এক কিশোরের মৃত্যু হয়।

দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর ষোলশহরের দুই নম্বর গেট এলাকায় ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে টিনের চাল উড়ে রাজিব (১৩) নামে এক কিশোর মারা যায়।

নগরীর পাঁচলাইশ থানা এলাকায় আরও এক কিশোর নিহত হয়েছে। নিহত কিশোরের নাম মো.রাকিব (১১)।

শনিবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে নগরীর পাঁচলাইশ থানার চিটাগং শপিং কমপ্লেক্সের পেছনে এ ঘটনা ঘটেছে।

এছাড়া সন্দিপ ও কুতুবদিয়ায় ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। তজুমদ্দিন উপজেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (পিআরও) মো. রাশেদ খান জানান, শুক্রবার রাত ৩টার দিকে হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে ঝড়ো হাওয়া আঘাত হানে। এতে গাছচাপা পড়ে শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে এক নারী এবং সকাল সাড়ে ৬টার দিকে এক শিশুর মৃত্যু হয়।

এ ছাড়া লালমোহন উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় ঝড় আতঙ্কে মো. ইউনুস নামে একজন মারা গেছেন। পটুয়াখালীর কলাপাড়া রাডার স্টেশনের কর্মকর্তা প্রকৌশলী প্রদীপ চক্রবর্তী জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ব্যাপ্তি ছিল দু’টি বাংলাদেশের সমান আকৃতির।

তিনি বলেন, সাগরের উপরি ও নিম্নভাগে অবস্থান নেয় রোয়ানু। অতি বৃষ্টিই বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে উপকূলকে রক্ষা করেছে। প্রদীপ চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশের সর্বত্র আঘাত অব্যাহত রেখেছে রোয়ানু। তবে তা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে আঘাত হানছে। শনিবার পায়রা সমুদ্র বন্দর এলাকা ত্যাগ করে রোয়ানুর গতিপথ মিয়ানমার ও ভারতের আসামের দিকে যাবে বলেও জানান তিনি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিন আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়, উত্তরপূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ আরো উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে আজ দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।

এটি আরো উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে চট্টগ্রামের কাছ দিয়ে বরিশাল-চট্রগ্রাম উপকূল অতিক্রম শুরু করেছে এবং পরবর্তী ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে উপকূল অতিক্রম সম্পন্ন করতে পারে। বুলেটিনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার যা দমকা অথবা ঝড়োহাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে। চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে সাত নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহও সাত নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

এ ছাড়া কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪-৫ ফুট বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। এর আগে রোয়ানুর প্রভাবে চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও সীতাকুণ্ডের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। ঝড়ের বেগে গাছপালা ভেঙে নগরী ও উপকূলের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের সময় ষোলশহর এলাকায় ঘরের চালা চাপা পড়ে প্রাণ হারায় এক কিশোর।

এর আগে সীতাকুণ্ড এলাকায় ঘরের উপর গাছ পড়ে কাজল বেগম ও তাঁর ছেলে বাবু মারা যায়। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সব ধরনের হ্যান্ডলিং বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি জেটিতে থাকা সব জাহাজ সাগরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন্দরের পরিচালক জাফর আলম।

ঘূর্ণিঝড়ের শুরুতেই ইপিজেডের সব কারখানা ছুটি ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। 

Share this post

scroll to top
error: Content is protected !!